বাতেনুজ্জামান জুয়েল
বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনে এক অনন্য তাৎপর্য বহন করে। এটি কেবল একটি নতুন বছরের সূচনা নয়; বরং একটি সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রতীক, যা বাঙালির ঐতিহ্য, ইতিহাস ও জীবনবোধকে নতুন করে উজ্জীবিত করে। প্রকৃতির নবীনতা, মানুষের মনোজগতের পরিবর্তন এবং সমাজের সমবেত আনন্দ—সব মিলিয়ে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে প্রাণের উৎসব।
বাংলা সনের প্রবর্তন ঘটে মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সনের সঙ্গে সৌর বছরের সমন্বয়ে বাংলা সনের সূচনা হয়। সেই থেকে বৈশাখ মাসের প্রথম দিনটি নতুন বছর হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। সময়ের পরিক্রমায় এটি ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিয়েছে।
পহেলা বৈশাখের সকাল শুরু হয় সূর্যের প্রথম কিরণকে বরণ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই মানুষ নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে বেরিয়ে পড়ে আনন্দ উৎসবে। নারীরা শাড়িতে লাল-সাদা রঙের শৈল্পিক মিশ্রণ, পুরুষরা পাঞ্জাবি-পায়জামা বা ফতুয়া পরে ঐতিহ্যের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে।
এদিনের বিশেষ আকর্ষণ ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে শুরু হয়ে আজ বিশ্বব্যাপী পরিচিত। ইউনেস্কোর স্বীকৃত এই ঐতিহ্যে মুখোশ, প্রতীকী ভাস্কর্য ও লোকজ উপাদানের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়গান। এটি কেবল একটি শোভাযাত্রা নয়, বরং বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
পহেলা বৈশাখের আরেকটি অনন্য দিক হলো বৈশাখী মেলা। গ্রামীণ জীবনের সরলতা ও লোকজ সংস্কৃতির অপূর্ব সমাহার দেখা যায় এই মেলায়। খেলনা, মাটির পাত্র, নকশিকাঁথা, লোকশিল্প—সবই এখানে জীবন্ত হয়ে ওঠে। পাশাপাশি গ্রামীণ খেলাধুলা, পুতুলনাচ, বাউল গান ইত্যাদি মানুষের মনে এক অন্যরকম আনন্দ জাগায়।
খাবারের ক্ষেত্রেও পহেলা বৈশাখের নিজস্ব ঐতিহ্য রয়েছে। ‘পান্তা-ইলিশ’ যেন এই দিনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। গরম ভাতের পান্তা, ভাজা ইলিশ, শুটকি ভর্তা, কাঁচা মরিচ ও পেঁয়াজ—এই সাধারণ খাবারেই লুকিয়ে থাকে বাঙালির সহজ-সরল জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি।
এই দিনটি ব্যবসায়ীদের জন্যও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পুরনো হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে নতুন খাতা খোলার প্রথা ‘হালখাতা’ নামে পরিচিত। দোকানপাটে মিষ্টি বিতরণ, ক্রেতাদের আমন্ত্রণ—সব মিলিয়ে এটি একটি সামাজিক বন্ধনের রূপ নেয়।
পহেলা বৈশাখ আমাদের শিখিয়ে দেয় নতুন করে শুরু করার প্রেরণা। অতীতের গ্লানি, দুঃখ ও ব্যর্থতা ভুলে নতুন আশা ও সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায় এই দিন। এটি কেবল একটি উৎসব নয়, বরং বাঙালির চেতনার এক অমূল্য অংশ, যা আমাদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে।
অতএব, পহেলা বৈশাখ বাঙালির হৃদয়ে চিরন্তন এক অনুভূতি, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ, ভালোবাসা ও মানবিকতার বার্তা নিয়ে। নতুন বছরের এই প্রথম দিনটি আমাদের জীবনে বয়ে আনুক শান্তি, সমৃদ্ধি ও অনন্ত সুখ—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।
— সম্পাদকীয় বিভাগ
দৈনিক দেশবাংলা সংবাদ
সম্পাদক : বাতেনুজ্জামান জুয়েল
Copyright © 2025 দেশবাংলা সংবাদ All rights reserved.