বাতেনুজ্জামান জুয়েল
যে হাতটি একদিন আঙুল ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিল, আজ সেই হাতেই বয়সের কাঁপুনি। যে কণ্ঠে একদিন ঘুমিয়ে পড়ত শিশুরা, আজ সেই কণ্ঠ অনেক সময় হারিয়ে যায় ঘরের ব্যস্ততার শব্দে। যে মানুষটি নিজের স্বপ্ন সরিয়ে রেখে সন্তানের স্বপ্নকে বড় করেছেন, জীবনের শেষ বিকেলে তাঁর চাওয়া বড় কিছু নয়—একটু কথা, একটু সময় আর আপনজনের মমতা।
আজ ১ অক্টোবর, ৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। সময়ের স্রোতে পৃথিবী যত আধুনিক হচ্ছে, ততই প্রয়োজন হয়ে উঠছে এই মানুষগুলোর দিকে ফিরে তাকানোর—যাঁদের ভালোবাসা, ত্যাগ ও শ্রমের ওপর ভর করেই আমাদের বেড়ে ওঠা।
প্রবীণরা শুধু আমাদের অতীতের কোনো অধ্যায় নন। তাঁরা আমাদের জীবনের ভিত্তি। তাঁদের বুকেই ভর করে আমরা ছোট থেকে বড় হয়েছি, তাঁদের হাত ধরেই শিখেছি প্রথম হাঁটতে, প্রথম কথা বলতে, জীবনের পথে প্রথম সাহস নিয়ে এগিয়ে যেতে। তাই বয়সের ভারে তাঁরা কখনোই পরিবারের বোঝা নন; বরং তাঁরা সেই ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের আজকের জীবন।
আমরা অনেক সময় ভুলে যাই—যে মানুষটি নিজের প্রয়োজনকে পেছনে রেখে আমাদের প্রয়োজন পূরণ করেছেন, আজ তাঁর প্রয়োজন হয়তো খুব সামান্য। পাশে বসে দুটো কথা বলা, একটু সময় দেওয়া, প্রয়োজনের মুহূর্তে হাতটি ধরে রাখা—এই সামান্য ভালোবাসাই তাঁর কাছে হয়ে উঠতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
একজন প্রবীণের মুখের প্রতিটি বলিরেখা যেন জীবনের দীর্ঘ পথচলার সাক্ষী। সেখানে আছে সন্তানকে বড় করার আনন্দ, সংসারের জন্য ত্যাগ, দুঃসময়ে লড়াই আর প্রিয়জনকে আগলে রাখার অসংখ্য গল্প। তাঁদের অভিজ্ঞতা কোনো ভার নয়; বরং আমাদের পথ চলার নীরব আলো।
যে বাবা সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন, যে মা সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য নিজের আরাম ভুলে থেকেছেন—বয়সের ভারে তাঁদের শরীর হয়তো নুয়ে যায়, কিন্তু পরিবারের প্রতি তাঁদের ভালোবাসা কখনো নুয়ে পড়ে না।
বার্ধক্য কোনো অপরাধ নয়; এটি জীবনের স্বাভাবিক গন্তব্য। আজ যিনি প্রবীণ, একদিন সেই জায়গায় দাঁড়াতে হবে আমাদেরই। তাই প্রবীণের প্রতি সম্মান আসলে নিজের ভবিষ্যতের প্রতিই সম্মান।
প্রবীণদের ভালো রাখতে সবসময় বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না। একটি ফোন, একটি হাসি, পাশে বসে কয়েক মিনিট কথা বলা, তাঁদের কথা মন দিয়ে শোনা কিংবা নিঃশব্দে হাতটি ধরে রাখা—এই ছোট ছোট ভালোবাসাই জীবনের শেষ বিকেলকে করে তুলতে পারে আলোয় ভরা।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস তাই শুধু একটি দিবস পালনের দিন নয়; এটি আমাদের হৃদয়ের কাছে ফিরে যাওয়ার দিন। মনে করিয়ে দেওয়ার দিন—ব্যস্ততা যতই বাড়ুক, আমাদের শিকড়কে যেন আমরা ভুলে না যাই।
কারণ তাঁরা আমাদের বোঝা নন— তাঁরাই আমাদের ভিত্তি।
যে বুকে ভর করে আমরা ছোট থেকে বড় হয়েছি, আজ সেই বুকটুকু যেন আমাদের ভালোবাসা ও সম্মানের আশ্রয় পায়।
জীবনটা আসলে একটি বৃত্ত। যে হাত একদিন আমাদের ধরে পথ দেখিয়েছিল, সময় ঘুরে একদিন সেই হাতটিই আমাদের কাছে ফিরে আসে। তখন সেই হাত সরিয়ে না দিয়ে আরও শক্ত করে ধরে রাখাই হোক আমাদের মানবিকতার পরিচয়।
৩৬তম আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে তাই আমাদের অঙ্গীকার হোক—প্রবীণদের শুধু মনে রাখা নয়, তাঁদের পাশে থাকা; শুধু সম্মান জানানো নয়, তাঁদের ভালোবাসা; শুধু দায়িত্ব পালন নয়, হৃদয় দিয়ে তাঁদের আপন করে নেওয়া।
যে হাত ধরে আমাদের পথচলা শুরু হয়েছিল, জীবনের শেষ প্রান্তে সেই হাতেই ফিরিয়ে দিই মমতার উষ্ণ স্পর্শ।
সম্পাদক : বাতেনুজ্জামান জুয়েল
Copyright © 2025 দেশবাংলা সংবাদ All rights reserved.