সাইয়্যেদ মুহাম্মদ শান্ত-পঞ্চগড় প্রতিনিধি:
পঞ্চগড়ে সার-বীজ ডিলার নিয়োগে অনিয়মের পাহাড়: যোগ্য আবেদনকারী বাদ, তিন বিতর্কিত নাম মন্ত্রণালয়ে
তদন্ত প্রতিবেদনে অসংগতি সত্ত্বেও সুপারিশের অভিযোগ; জেলা প্রশাসন ও মনিটরিং কমিটির ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নে সরকারি সার ও বীজ ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও শর্ত লঙ্ঘনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। ১৬ জন আবেদনকারীর তথ্য যাচাই-বাছাই ও তদন্ত প্রতিবেদনে একাধিক অসংগতি উঠে আসার পরও তা উপেক্ষা করে বিতর্কিত তিন আবেদনকারীর নাম কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, নীতিমালার শতভাগ শর্ত পূরণ করা সত্ত্বেও যোগ্য আবেদনকারীকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সরকারের কৃষিবান্ধব নীতির তোয়াক্কা না করে তৈরি করা এই সুপারিশ তালিকা নিয়ে স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ী মহলে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
অনিয়মের সুনির্দিষ্ট চিত্র ও নীতিমালার চরম লঙ্ঘন
অভিযোগের নথি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সার ও বীজ ডিলার নিয়োগের জন্য কার্যকর সরকারি নীতিমালা সম্পূর্ণ তোয়াক্কা না করে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি তিন প্রতিষ্ঠানের নাম কৃষি মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ হিসেবে পাঠিয়েছে। উক্ত তিন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো হলো:
মেসার্স লিয়ন এন্টারপ্রাইজ (এক পরিবার, এক গোডাউন):
নীতিমালা অনুযায়ী একই পরিবার থেকে একাধিক ব্যক্তি সার ডিলারের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন না। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, লিয়ন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারীর পরিবারের একাধিক সদস্য ভিন্ন ভিন্ন নামে আবেদন করেছেন এবং তিনটি আবেদনের বিপরীতে মাত্র একটি গোডাউন প্রদর্শন করা হয়েছে।
মেসার্স শাহজাহান খান (ইউনিয়নের বাইরে ভোটার):
ডিলার নিয়োগের প্রাথমিক ও মৌলিক শর্ত হলো আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের (অমরখানা) স্থায়ী বাসিন্দা ও ভোটার হতে হবে। অথচ অভিযুক্ত শাহজাহান খান সংশ্লিষ্ট অমরখানা ইউনিয়নের ভোটার নন; তিনি পঞ্চগড় পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নিবন্ধিত ভোটার।
মেসার্স আসিক ট্রেডার্স (গোডাউন ও জমিসংক্রান্ত ক্রুটি) ডিলারশিপের জন্য নিজস্ব গোডাউন থাকা বাধ্যতামূলক। তবে আসিক ট্রেডার্সের নিজস্ব কোনো গোডাউন নেই। পৈতৃক জমিতে একটি অবকাঠামো দেখানো হলেও জমির আইনি বণ্টননামা বা বৈধ স্বত্বাধিকার সংক্রান্ত কোনো বৈধ কাগজপত্র দাখিল করা হয়নি।
বাদ পড়েছেন শতভাগ যোগ্য আবেদনকারী
অন্যদিকে, মেসার্স তিন বোন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ছোলায়মান আলী অভিযোগ করেন, তিনি ডিলার নিয়োগ নীতিমালার সব শর্ত ও যোগ্যতা শতভাগ পূরণ করে আবেদন জমা দিয়েছিলেন। গোডাউন, জমির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ব্যাংক সচ্ছলতা এবং স্থানীয় ভোটার হওয়ার সমস্ত বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনকভাবে তাঁর নাম কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো সুপারিশ তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ছোলায়মান আলী ও স্থানীয়দের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদনে কারচুপি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রকৃত যোগ্যদের বঞ্চিত করা হয়েছে। নাম বাদ দেওয়ার নির্দিষ্ট কোনো যৌক্তিক কারণ বা পয়েন্টভিত্তিক মূল্যায়নপত্র প্রকাশ না করায় পুরো প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা এখন বড় প্রশ্নের মুখে।
জেলা প্রশাসনের মনিটরিং কমিটির সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন
জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন ডিলার নিয়োগ ও মনিটরিং কমিটি কীভাবে নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং তদন্ত প্রতিবেদনের মন্তব্য কলামে উল্লেখ থাকা অসংগতিগুলোকে পাশ কাটিয়ে বিতর্কিতদের নাম সুপারিশ করল, তা নিয়ে নানা গুঞ্জন তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের মতে, সরকারি সার বিতরণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং প্রান্তিক কৃষকের হাতে সময়মতো সঠিক মূল্যে সার-বীজ পৌঁছে দেওয়ার জন্য সততা ও যোগ্যতার বিকল্প নেই। অথচ এমন স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হলে স্থানীয় কৃষি খাতে নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে।
৫-দফা দাবি ও কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা
কৃষক ও যোগ্য আবেদনকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় এবং প্রক্রিয়াটিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে অবিলম্বে কর্তৃপক্ষের কাছে ৫-দফা দাবি জানানো হয়েছে:
পুনর্বিবেচনা ও পুনর্নিরীক্ষণ: অমরখানা ইউনিয়নের ১৬ জন আবেদনকারীর তদন্ত প্রতিবেদন ও প্রাথমিক মন্তব্যের কলাম নতুন করে পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করতে হবে।
বিতর্কিতদের যোগ্যতা পুনরায় পরীক্ষা: মেসার্স লিয়ন এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স শাহজাহান খান ও মেসার্স আসিক ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে ওঠা ভোটার তালিকা, গোডাউন ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগসমূহ সরকারি নীতিমালার আলোকে পুনঃপরীক্ষা করতে হবে।
প্রকৃত যোগ্যদের নাম অন্তর্ভুক্তকরণ: মেসার্স তিন বোন ট্রেডার্সের দাখিলকৃত সব নথিপত্র পুনঃমূল্যায়ন করে নাম বাদ পড়ার স্পষ্ট কারণ প্রকাশ ও তালিকায় অন্তর্ভুক্তির পদক্ষেপ নিতে হবে।
দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা: প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়ম বা তথ্য গোপনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা কমিটির বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
সমমানদণ্ডে স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত: স্বজনপ্রীতি মুক্ত রেখে সব আবেদনকারীর ক্ষেত্রে অভিন্ন সরকারি নীতিমালা ও মানদণ্ড প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিবেদকের মূল্যায়ন
সার ও বীজ ডিলার নিয়োগ কেবল একটি ব্যবসায়িক লাইসেন্স প্রদান নয়, এটি সরাসরি গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি সুরক্ষার সাথে যুক্ত। এ প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের অনিয়ম ও অনভিপ্রেত সিদ্ধান্ত প্রান্তিক কৃষকদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সম্পাদক : বাতেনুজ্জামান জুয়েল
Copyright © 2025 দেশবাংলা সংবাদ All rights reserved.