বাতেনুজ্জামান জুয়েল
আষাঢ়ের বৃষ্টি বরাবরই বাংলার প্রকৃতিকে নতুন প্রাণ দেয়। কিন্তু এবার সেই বৃষ্টিই যেন হয়ে উঠেছে দীর্ঘশ্বাসের আরেক নাম। টানা বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বিস্তীর্ণ জনপদ আজ বন্যার পানিতে বিপর্যস্ত। নদী তার স্বাভাবিক গতিপথ ছেড়ে মানুষের ঘরে, উঠোনে, কৃষিজমিতে এবং জীবন-জীবিকায় ঢুকে পড়েছে। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপে অসহায় হয়ে পড়েছে লাখো মানুষ।
বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে পাহাড়ি ঢল এবং ভারী বর্ষণে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও শেরপুরে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের রংপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারীতেও নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
যে মাঠে কয়েক দিন আগেও বাতাসে দুলছিল সবুজ ধানের শিষ, আজ সেখানে কেবল থইথই পানি। কৃষকের বছরের পর বছর লালিত স্বপ্ন, জেলের মাছের ঘের, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পুঁজি এবং দিনমজুরের জীবিকার পথ একে একে ডুবে যাচ্ছে বন্যার স্রোতে। কোথাও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। নিরাপদ পানীয় জল, শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
প্রতিটি দুর্যোগ আমাদের একটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়—আমরা কতটা প্রস্তুত? প্রতিবছর বর্ষা আসে, বন্যাও আসে; কিন্তু দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নদী ব্যবস্থাপনা এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা বারবার সামনে আসে। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে এমন চরম আবহাওয়া এখন আর ব্যতিক্রম নয়; বরং নতুন বাস্তবতা।
তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো নিভে যায়নি। সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড, প্রশাসন, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষ দুর্গতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। নৌকায় করে পৌঁছে যাচ্ছে ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি ও ওষুধ। মানবতার এই শক্তিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
বন্যার পানি একদিন নেমে যাবে, নদী আবার তার নিজস্ব ছন্দে ফিরবে। কিন্তু যাদের ঘর ভেসে গেছে, যাদের ফসল হারিয়ে গেছে, যাদের সন্তান আজ অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে—তাদের ক্ষত শুকাতে সময় লাগবে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ।
প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে নয়, প্রকৃতিকে বুঝে এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে গেলেই দুর্যোগের ক্ষতি কমানো সম্ভব। এই কঠিন সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় হোক—আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়াতে জানি।
সম্পাদক : বাতেনুজ্জামান জুয়েল
Copyright © 2025 দেশবাংলা সংবাদ All rights reserved.