বাতেনুজ্জামান জুয়েল
তালাক শব্দটি আমাদের সমাজে বেশ সংবেদনশীল।পবিত্র হাদিসে আছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হালাল হলো তালাক। এই শব্দটি উচ্চারণ
করলে আরশ পর্যন্ত কেপে ওঠে।তালাক দাম্পত্য জীবনের বিচ্ছেদ শুধু দুই ব্যক্তির নয়, দুটি পরিবারের সম্পর্কেও গভীর প্রভাব ফেলে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তালাকের হার বাড়ছে—এর পেছনে সামাজিক, মানসিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত নানা কারণ কাজ করে। তাই এই বিষয়টি নিয়ে সচেতন আলোচনা অত্যন্ত প্রয়োজন।
তালাকের বর্তমান চিত্র
আধুনিক সমাজে নারী-পুরুষ উভয়ের আর্থিক স্বাধীনতা বেড়েছে, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে সম্পর্কের সমস্যাগুলো লুকিয়ে রাখার প্রবণতা কমছে। কেউ আর অযথা অত্যাচার বা অসম্মান সহ্য করতে চান না। এই পরিবর্তিত মানসিকতা তালাকের হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
তালাকের প্রধান কারণসমূহ
১. মানসিক অমিল ও যোগাযোগ ঘাটতি
দাম্পত্য জীবনে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কথোপকথন। অনেক সময় ছোট ভুল বোঝাবুঝি বড় রূপ নেয়, কারণ দু’জনই নিজেদের কথা স্পষ্টভাবে বলতে পারে না। সময়ের সঙ্গে আবেগগত দূরত্ব বাড়ে এবং সম্পর্ক দুর্বল হয়।
২. অর্থনৈতিক চাপ
বেকারত্ব, আয় অপ্রতুলতা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা—এসব কারণে দাম্পত্য জীবনে চাপ সৃষ্টি হয়। আর্থিক সংকট হলে পরিবারে অশান্তি বাড়ে যা অনেক সময় বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে যায়।
৩. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব
ফেসবুক, মেসেঞ্জার, টিকটকের অতিরিক্ত ব্যবহার অনেক সম্পর্কেই সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং দূরত্বের সৃষ্টি করছে। অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ বা গোপনীয়তার লঙ্ঘন দাম্পত্য জীবনে বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৪. পারিবারিক হস্তক্ষেপ
শ্বশুরবাড়ি বা নিজের পরিবারের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ অনেক সময় দাম্পত্য জীবনে অশান্তির কারণ হয়। দুইজনের সম্পর্ক যখন অন্যদের দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন ভুল বোঝাবুঝি আরও গভীর হয়।
৫. গার্হস্থ্য নির্যাতন
শারীরিক, মানসিক বা আর্থিক নির্যাতনের কারণে অনেক নারী বাধ্য হয়ে তালাকের সিদ্ধান্ত নেন। এটাকে আজ আর লুকিয়ে রাখা হয় না—আইন ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে নারী এখন অনেক বেশি সচেতন।
---
তালাকের সামাজিক প্রভাব
১. সন্তানদের উপর প্রভাব
তালাকপ্রাপ্ত দম্পতিদের সন্তানরা মানসিক চাপ, অনিশ্চয়তা ও আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগে। মা-বাবার বিচ্ছেদ শিশুদের বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক নিয়মকে ব্যাহত করে।
২. সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা
বাংলাদেশের মতো সমাজে তালাক এখনো একটি চাপা ট্যাবু। বিশেষ করে নারীরা সমাজের নানা সমালোচনা, কটূক্তি ও অবমূল্যায়নের মুখে পড়েন।
৩. আর্থিক সমস্যা
বিচ্ছেদের পর নারীরা প্রায়ই আর্থিক সংকটে পড়েন, বিশেষ করে যদি তারা কর্মজীবী না হন। সন্তান পালনের ব্যয়ও অনেক সময় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
---
তালাক রোধের উপায়
১. দাম্পত্য-পূর্ব পরামর্শ
বিয়ের আগে মানসিক প্রস্তুতি, দায়িত্ববোধ এবং সম্পর্কের সঠিক বোঝাপড়া থাকলে ভবিষ্যতে বিচ্ছেদের সম্ভাবনা কমে যায়।
২. পরস্পরের প্রতি সম্মান ও ধৈর্য
একজন আরেকজনের মানসিকতা, পছন্দ-অপছন্দ এবং ব্যক্তিগত সীমার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো দাম্পত্য সুখের চাবিকাঠি।
৩. কাউন্সেলিং বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সহায়তা
বহু ক্ষেত্রে পেশাদার পরামর্শদাতা দম্পতির সম্পর্ক আবারও সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারেন।
৪. পরিবারকে সীমানার মধ্যে রাখা
দাম্পত্য জীবনে পরিবারের ভূমিকা থাকলেও, হস্তক্ষেপ যেন ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে নিয়ন্ত্রণ না করে, সেই বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
৫. প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সম্পর্কে সচেতন থাকা, গোপনীয়তা রক্ষা ও অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ দূর করা প্রয়োজন।
---
শেষ কথা
তালাক কোনো সফলতার পথ নয়, আবার এটি জীবনের সমাপ্তিও নয়। এটি কেবল একটি সিদ্ধান্ত, যা নেওয়া হয় সম্পর্কের সুরক্ষার সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ হলে। সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, ধৈর্য ও বোঝাপড়া। সমাজে সচেতনতা বাড়লে এবং সমস্যার সমাধান খোঁজার সংস্কৃতি তৈরি হলে তালাকের হার কমবে এবং পরিবারগুলো হবে আরও সুদৃঢ়।
সম্পাদক : বাতেনুজ্জামান জুয়েল
Copyright © 2025 দেশবাংলা সংবাদ All rights reserved.