কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি মো. আব্দুল আজিজ মিয়া
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও প্রবল স্রোতের প্রভাবে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীতে ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। জেলার রাজারহাট, উলিপুর, নাগেশ্বরী, ফুলবাড়ী, ভুরুঙ্গামারী ও রৌমারী উপজেলার অন্তত ৩৮টি স্থানে ভাঙন অব্যাহত থাকায় নদীতীরবর্তী হাজারো মানুষ চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ইতোমধ্যে শতাধিক বসতভিটা ও কয়েকশ বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে আরও সহস্রাধিক পরিবার।
স্থানীয় সূত্র ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকদিন ধরে নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতের কারণে বিভিন্ন এলাকায় নদীতীর ধসে পড়ছে। অনেক স্থানে নদী বসতঘরের একেবারে কাছাকাছি চলে আসায় পরিবারগুলো ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
শুক্রবার সকালে রাজারহাট উপজেলার রামহরি গ্রামে তিস্তা নদীর তীব্র ভাঙনে অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি বসতভিটা এবং প্রায় আট বিঘা কৃষিজমি নদীগর্ভে চলে যায়। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে গ্রামের আরও বিস্তীর্ণ এলাকা নদীতে বিলীন হতে পারে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ইদ্রিস আলী বলেন, “নিজের চোখের সামনে বাড়িঘর আর ফসলি জমি নদীতে হারিয়ে যেতে দেখেছি। মানুষের সহায়তায় ঘর সরাতে পারলেও এখন পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব, জানি না।”
একই গ্রামের বাসিন্দা আতাউর রহমান বলেন, “সারা জীবনের কষ্টে গড়া বাড়িটি মুহূর্তেই নদীতে চলে গেছে। নতুন করে ঘর নির্মাণের মতো সামর্থ্য আমার নেই।”
এদিকে ফুলবাড়ী উপজেলার গোড়কমন্ডল এলাকায় ধরলা নদীর ভাঙনও উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা চাঁনবানু বেগম জানান, কয়েক বিঘা ফসলি জমি হারানোর পর এখন তাদের বসতভিটাও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। মাহমুদা বেগম বলেন, “নদী বাড়ির খুব কাছে চলে এসেছে। দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে আমাদেরও সব হারাতে হবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঝুঁকিপূর্ণ কিছু এলাকায় বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেক স্থানে তীব্র স্রোতে জিওব্যাগ সরে যাওয়ায় ভাঙন প্রতিরোধে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে না।
কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, জেলার বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙনের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্রুত কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অসংখ্য পরিবার গৃহহীন হবে এবং মানবিক সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্থানে বাঁশ ও কাঠের পাইলিংয়ের মাধ্যমে নদীতীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই ভয়াবহ নদীভাঙনে কুড়িগ্রামের নদীপাড়ের মানুষের জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, প্রতিবছরের অস্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নয়, স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীভাঙনের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।
সম্পাদক : বাতেনুজ্জামান জুয়েল
Copyright © 2025 দেশবাংলা সংবাদ All rights reserved.