দেলোয়ার হোসেন রশিদী, চট্টগ্রাম
আদৌ কোন মসজিদের ইমাম নন। ইমামদের কোন নির্বাচিত প্রতিনিধি ও নন। অথচ তিনি নিজেকে দাবি করেন 'জাতীয় ইমাম সমিতির মহাসচিব' হিসেবে। আর এ পরিচয়ে বিচরণ করেন সর্বত্র। অংশ নেন বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান সমূহে। রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ভেঙ্গে নিয়মিত যাতায়াত করেন সচিবালয়, গণভবন এবং বঙ্গভবনে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মন্ত্রী সচিবদের সাথে ছবি তুলে তা প্রকাশ করেন ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। *এভাবে ইমামদের কল্যাণের কথা বলে বিভিন্ন দানশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন একজন সরকারি চাকরিজীবী।* তিনি আর কেউ নন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একসময়ের কেয়ারটেকার ও বর্তমান ধর্মীয় প্রশিক্ষক শাহ নজরুল ইসলাম।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্র জানায় শাহ নজরুল ইসলামের সর্বশেষ নিয়োগ ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির
ধর্মীয় প্রশিক্ষক হিসেবে। তবে বর্তমানে প্রভাব খাটিয়ে তিনি ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির ঢাকায় একপদ উপরে উপ-পরিচালকের চেয়ার দখলে রেখেছেন । এর আগে তিনি মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পে কেয়ারটেকার হিসেবে যোগদান করেন। পরে তদবিরের মাধ্যমে তিনি ওই প্রকল্পে সুপারভাইজার পদে উন্নীত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমিতে জনবল নিয়োগের সময় বয়স সংক্রান্ত জটিলতা থাকা সত্ত্বেও তিনি আবেদন করেন। প্রাথমিকভাবে আবেদন বাতিল হলেও পরে প্রভাব খাটিয়ে তা বহাল রাখা হয় এবং শেষ পর্যন্ত তিনি প্রশিক্ষক পদে নিয়োগ পান।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্র জানায় বিগত ১৫ বছর তিনি সিলেট অঞ্চলে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমিতে দাপটের সাথে চাকরি করেছেন। এ সময় তিনি আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাদের চেয়েও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে “আল্লাহর অলি” হিসেবে বক্তৃতা দিয়েছেন। তার কন্যা শেখ হাসিনাকে "একশো বছর ক্ষমতায় থাকার জন্য " দোয়া করেতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বঙ্গবন্ধুকে বায়েজিদ বোস্তামীর বংশধর দাবি করে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন। সে সব বক্তব্য ফেসবুক সহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতেন। ৫ আগস্টের পর তিনি দ্রুত এসব ডিলিট করে ফেলেন।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন সিলেট কার্যালয় সুত্র জানায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রধান কার্যালয়ের বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি মহিউদ্দিন মজুমদারের সিলেট সফর উপলক্ষে অফিসের ছাদ বাগানের বরাদ্দের অর্থ দিয়ে রাতারাতি টেলিভিশন ও এয়ারকন্ডিশনার কেনা হয়। পরে প্রশিক্ষণরত ইমামদের শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করে রাতের আঁধারে ছাদ বাগানের কাজ সম্পন্ন করা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের পর তিনি নিজেকে জামায়াতপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। এমনকি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে মৌলভীবাজার এলাকায় জামায়াত-সমর্থিত এক প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন বলেও স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। নির্বাচনের পর তাকে বিএনপির ঘনিষ্ঠ হিসেবেও দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তার বয়স নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, শাহ নজরুল ইসলামের প্রকৃত বয়স ৭০ বছরের বেশি হলেও সরকারি নথিতে এখনো তা ৫৫ বছরের নিচে দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বয়স জালিয়াতির মাধ্যমেই তিনি সরকারি চাকরিতে বহাল আছেন এবং পরবর্তীতে প্রশিক্ষক পদেও যোগদান করেন।
শাহ নজরুল ইসলামের ব্যাক্তি জীবন নিয়ে ও রয়েছে নানা আলোচনা। তিনি প্রথম স্ত্রী এবং পরিবারের কাছে দ্বিতীয় বিয়ে করার কথা গোপন রাখেন। এ অবস্থায় দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সরকারি বাংলোতে থাকার কথা জেনে প্রথম স্ত্রী প্রায় ওই বাংলোতে অভিযান চালাতেন। এরপর থেকে প্রথম স্ত্রী সাথে করে অফিসে দিয়ে যেতেন এবং নিয়ে যেতেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে শাহ নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারি চাকরি করলেও তিনি মাঝে মাঝে অফিসে যোহরের নামাজে ইমামতী করেন। তিনি ইমামতির দায়িত্ব দিলে পারবেন। ইমাম সমিতির সভাপতি এবং সেক্রেটারি কোন নির্বাচনের মাধ্যমে হয়নি বলে তিনি স্বীকার করেন। বিভিন্ন দানশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা অনুদান নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, কোটি কোটি নয় মাঝে মাঝে কয়েক লক্ষ টাকা বিভিন্ন দানশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে নেয়না এবং সেটি ইমামদের কল্যাণে ব্যয় করেন। অনিমা মেয়ের কল্যাণে কত টাকা ব্যয় করেছেন এ সংঘটিতে জিজ্ঞাসা করলে তিনি পরে যোগাযোগ করতে বলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শাহ নজরুল ইসলামের নিয়োগ, বয়স, পদায়ন, ‘জাতীয় ইমাম সমিতি’র পদ, অনুদান সংগ্রহ ও ব্যয়ের হিসাব এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগগুলো পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সরকারি পরিচয় ব্যবহার করে কোনো বেসরকারি সংগঠনের পদে থেকে অনুদান সংগ্রহ করা হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে সেই অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে এবং তার হিসাব-নিকাশ কী, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
শাহ নজরুল ইসলাম --
মোবাইল ফোন +880 1798-414125
সম্পাদক : বাতেনুজ্জামান জুয়েল
Copyright © 2025 দেশবাংলা সংবাদ All rights reserved.