দেশবাংলা ডেস্ক
নওগাঁয় বিদ্যুৎ লাইনের জন্য একসঙ্গে শত শত তালগাছের মাথা কেটে ফেলার ঘটনা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি আমাদের উন্নয়ন দর্শনের বিরুদ্ধে একটি ভয়াবহ অভিযোগপত্র। হিসাব বলছে, প্রতি এক-দুইটি লাইনের জন্য নয়—একটি বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার খাতিরে প্রায় ৭৫০টি তালগাছের মাথা কাটা হয়েছে। এই সংখ্যা শুধু শিউরে ওঠার মতো নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতার প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি।
প্রশ্ন উঠছে—এই তালগাছগুলো কি হঠাৎ করেই বিদ্যুৎ লাইনের নিচে জন্ম নিল? নাকি পরিকল্পনাকারীরা শুরু থেকেই প্রকৃতিকে অপ্রয়োজনীয় ভেবে বাদ দিয়েছিলেন? বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সঞ্চালন নিঃসন্দেহে প্রয়োজন, কিন্তু সেই প্রয়োজন কি এতটাই অন্ধ যে, তার পথে দাঁড়ালেই কেটে ফেলতে হবে শতাব্দীপ্রাচীন গাছ?
তালগাছ গ্রামবাংলার সৌন্দর্যের অংশমাত্র নয়। এটি বজ্রপাত প্রতিরোধে কার্যকর প্রাকৃতিক ঢাল, ঝড়ের সময় প্রাণরক্ষাকারী ছাতা, জলবায়ু সংকটে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী এক অব্যক্ত সৈনিক। রাষ্ট্র যখন নিজেই বজ্রপাতকে দুর্যোগ ঘোষণা করে তালগাছ রোপণের কর্মসূচি নেয়, তখন সেই রাষ্ট্রেরই এক বিভাগের হাতে তালগাছ নিধন কীভাবে বৈধ হয়? এটি কি দ্বিচারিতা নয়? নাকি উন্নয়নের নামে আমরা নিজেদের সিদ্ধান্তকেই অস্বীকার করছি?
আরও গভীর প্রশ্ন হলো—এই ধ্বংসের আগে কোনো পরিবেশগত সমীক্ষা হয়েছিল কি না। বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন কোথায়? স্থানীয় জনগণের মতামত নেওয়া হয়েছিল কি? নাকি এসব প্রশ্ন “সময় নষ্ট” মনে করে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে? যদি আইন অনুসরণ করা না হয়, তবে আইন কাদের জন্য?
উন্নত রাষ্ট্রগুলো বিদ্যুৎ লাইন স্থাপনের সময় গাছ বাঁচানোর শত উপায় খোঁজে—লাইন উঁচু করে, বিকল্প রুট বেছে নিয়ে, প্রয়োজনে ভূগর্ভস্থ কেবল ব্যবহার করে। অথচ আমরা কেন বারবার সহজতম, কিন্তু সবচেয়ে ক্ষতিকর পথটিই বেছে নিই? কারণ কি এই যে, গাছ প্রতিবাদ করতে পারে না?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এই নিধনের দায় কারও কাঁধে দেখা যাচ্ছে না। কেউ বলছে “উপরের নির্দেশ”, কেউ বলছে “প্রকল্পের প্রয়োজনে”। কিন্তু প্রকৃতি ধ্বংসের দায় কি কেবল বাতাসে ভাসবে? নাকি কোনো একসময় তার হিসাব দিতে হবে?
আজ তালগাছের মাথা কাটা হচ্ছে, কাল হয়তো পুরো গাছ, পরশু জলাশয়, তারপর বনভূমি। এভাবেই কি আমরা উন্নয়নের সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে নামছি? বিদ্যুৎ থাকলেও যদি বজ্রপাতে মানুষ মারা যায়, যদি ঝড়ে ঘর উড়ে যায়—তবে সেই উন্নয়ন কাদের জন্য?
এই সম্পাদকীয় কোনো উন্নয়নবিরোধী আর্তনাদ নয়। এটি দায়িত্বশীল উন্নয়নের দাবি। আমরা আলো চাই—কিন্তু অন্ধকারের বিনিময়ে নয়। আমরা বিদ্যুৎ চাই—কিন্তু প্রকৃতির লাশের ওপর দাঁড়িয়ে নয়।
এখনই যদি প্রশ্ন না তুলি, এখনই যদি জবাবদিহি না চাই—তবে একদিন আলো জ্বলবে, কিন্তু সেই আলোয় আমরা নিজেদের অপরাধই দেখতে পাব।
সম্পাদক : বাতেনুজ্জামান জুয়েল
Copyright © 2025 দেশবাংলা সংবাদ All rights reserved.