বাতেনুজ্জামান জুয়েল
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন — বাংলাদেশ রাজনীতির এক অদ্বিতীয় নক্ষত্র, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিপ্লবী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ভোর ৬টায় চিরচ্ছন্দে পরিণত হয়েছেন, তিনি আর নেই।
দীর্ঘ রোগ ও বার্ধক্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে, যেখানে দেশের সহকর্মী, সমর্থক ও অনুগতদের চোখেও জন্মেছে অগণিত অশ্রু।
১. গৃহিণী থেকে ইতিহাসের এক রহস্যময় কবি:
খালেদা জিয়ার জীবন শুরু হয়েছিল রাজনীতির বাইরে। গৃহিণী থেকে তিনি উঠে দাঁড়ালেন সেই অগ্নিপরীক্ষায়, যেখানে ব্যথা ও পরাজয় একাকার হয়ে ওঠে। ১৯৮১ সালে তাঁর স্বামী, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর, তিনি বিএনপি’র নেতৃত্ব গ্রহণ করেন — এবং সেই থেকে শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামী গল্প। 
তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা ছিলো এক গভীরভাবে জটিল অভিজ্ঞতা; স্বপ্ন, বিপ্লব, ক্ষমতা, সংগ্রাম ও কষ্টের মিলিত রূপ। তিনি শুধু একটি দল চালাতে যাননি — জনতার আত্মবিশ্বাস ও আবেগকে নিজ হাতে আঁকেন, রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে আত্মবিশ্বাসে ভরে দেন।
২. ইতিহাসে প্রথম: বাংলার প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী:
১৯৯১ সালে নির্বাচন জয় করে তিনি বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হন — যা কেবল একটি প্রশাসনিক পদ না, বরং একটি ঐতিহাসিক আলোকরেখা ছিলো। মুসলিম-গভীর বিশ্বের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এটি ছিল বিরল ও অনন্য।
তিনি ক্ষমতার শীতল আসনে বসে শুধু নীতিনির্ধারণ করেননি, বরং দেশে সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও যুব শক্তিকে আঁকড়ে ধরার একটি যুগান্তকারী দিক স্থাপন করেন।
৩. দুশমনকেও প্রয়োজনীয় ভুলে সাজানো:
রাজনৈতিক জীবনে তাঁর দীর্ঘতম প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল দলের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা-র সঙ্গে। এই “বেগমদের যুদ্ধ” পাকিস্তান উপ-মহাদেশের রাজনৈতিক মনমুদ্ধ ইতিহাসে প্রবল আলোচ্য। কখনও বন্ধুত্ব, কখনও রক্তক্ষয়ের রং, এবং প্রায়ই অনিন্দ্যসুন্দর টানাপোড়েনে बुন্ধনের শিকলে আবদ্ধ — এই দুই নেত্রীর পার্থক্য ও সংঘাত একটি প্রজন্মের রাজনীতিকে গভীর ছাপ দিয়েছে।
৪. অত্যাচার, নির্যাতন এবং পুনরুত্থান:
খালেদা জিয়া কখনই সহজ জীবন চাননি। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাঁকে বন্দি করেছে, দমন-পীড়নে আবদ্ধ রেখেছে, এবং দীর্ঘ সময় অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে। নির্যাতন, দমন, মামলা — সবকিছুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর সহানুভূতিকে শক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
অবশেষে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তাঁর অন্তর্নিহিত শক্তির পুনরুত্থান ঘটে, যেখানে বিপ্লবের স্রোতে তিনি নতুনভাবে রাজনৈতিক জীবনে ফিরে আসেন — মানবিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে নিজের অস্তিত্বের প্রতি অম্লান প্রমাণ রেখে।
৫. নীতি, দর্শন ও মানবিক মূল্যবোধ:
খালেদা জিয়ার নীতি ছিল সর্বদা দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো — শিক্ষা, নারীর অধিকার, ক্ষমতার ভারসাম্য ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তাঁর বিশ্বাসের মূল স্তম্ভ। নেত্রী হিসেবে তিনি বারবার ঘোষণা দিয়েছেন, সমাজ পরিবর্তনের গতি নৈতিকতার ভিত্তিতেই সম্ভব।
তাঁর দর্শন ছিল একরকম মানবিক সারল্য — ক্ষমতার উত্তাপে নয়, মানুষের হতাশ আর শক্তিকে আঁকড়ে ধরার মধ্যেই উন্নয়নের সন্ধান।
৬. বাংলাদেশের স্মৃতিতে অম্লান পথচিহ্ন:
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু শুধু একজন রাজনীতিকের অর্থহীন অস্তিত্বের অবসান নয় — এটি এক অধ্যায়ের শেষ, এক গল্পের নিরব সমাপ্তি। তার সংগ্রাম, আশা, আবেগ ও দায়িত্বের প্রতিটি ধাপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অম্লান চিহ্ন রেখে গেছে।
সমগ্র জাতি আজ তার স্মৃতিকে শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে, আর তার রাজনৈতিক জীবনের প্রতিচ্ছবি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রেরণা জোগাবে — সেই বার্তা দিয়ে যা রাজনৈতিক দিগন্তে একটি অনন্য অধ্যায় হিসেবে চিরকাল টিকে থাকবে। �
বাংলা টেলিগ্রাফ
৭. শেষ শ্বাস — তবে সমাপ্ত নয় স্মৃতি:
আজ পশ্চিমা আকাশে, দেশের রক্তিম সূর্যোদয়ের মাঝেই তিনি নিজস্ব কবিতা হয়ে গেছেন — ইতিহাসের এক আলোচ্য স্থানে স্থির। তাঁর জীবন, দর্শন ও সংগ্রাম আমাদের মনে রেখেছে একটি প্রশ্ন: একটি নেতা কি কেবল ক্ষমতার প্রতীক, নাকি মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি, বিশ্বাস ও আশা-আকাঙ্ক্ষার এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি?
জীবনের শেষ প্রহরে তিনি যেমন নিঃশব্দে চলে গেলেন, তেমনি তাঁর স্মৃতি, সংগ্রাম ও ইতিহাস অজানাকে আলো দিয়ে পথ দেখানো এক অনন্য সংগ্রামী প্রতিমূর্তি হয়ে রয়ে যাবে — একটি নিঃশেষ স্রোতের মতো, যা আমাদের অন্তরে চিরকাল প্রবাহিত হবে। �
BSS
📜 পরিশেষে :
বেগম খালেদা জিয়া — নামটি শুধু একটি রাজনীতিকের নাম নয়, বরং একটি জীবন্ত ইতিহাস; সংগ্রাম, সাহসিকতা, মানবিকতা ও রাজনৈতিক দৃঢ়তার এক অনন্য প্রতীক। তাঁর বিদায় কেবল সমাপ্তি নয়, বরং আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা, শিক্ষক ও স্মরণীয় এক অধ্যায়।
সম্পাদক : বাতেনুজ্জামান জুয়েল
Copyright © 2025 দেশবাংলা সংবাদ All rights reserved.