বাতেনুজ্জামান জুয়েল:
আজ বাংলাদেশ থমকে গিয়েছিল।
রাজপথ থমকে গিয়েছিল।
শব্দ থেমে গিয়ে জন্ম নিয়েছিল এক গভীর, ভারী নীরবতা—যে নীরবতা কেবল শোকের নয়, ইতিহাসেরও।
ভোরের আলো ফোটার অনেক আগেই মানুষ নামতে শুরু করে ঢাকার পথে পথে। কেউ এসেছেন দূর গ্রামের মেঠোপথ পেরিয়ে, কেউ রাত জেগে বাসে-ট্রাকে, কেউ হেঁটে, কেউ চোখে জল আর বুকে অদ্ভুত এক ভার নিয়ে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, সংসদ ভবন এলাকা, আশপাশের অলিগলি—সব মিলিয়ে রাজধানী রূপ নেয় এক বিশাল মানবসমুদ্রে। যতদূর চোখ যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ।
নামাজে জানাজা শুরুর আগেই স্পষ্ট হয়ে যায়—এটি আর সাধারণ কোনো বিদায় নয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কোনো জানাজায় এত মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়নি।
সংখ্যার হিসাব এখানে অর্থহীন; কারণ এই জনসমাবেশ ছিল আবেগের, স্মৃতির, আর দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা অনুভূতির বিস্ফোরণ।
ভিড়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধটির চোখে ছিল দীর্ঘ জীবনের ক্লান্তি, তরুণটির চোখে ছিল অশ্রু আর বিস্ময়—একই কাতারে দাঁড়িয়ে সবাই যেন বুঝে নিচ্ছিল, তারা কেবল একজন মানুষকে নয়, একটি সময়কে, একটি অধ্যায়কে বিদায় জানাতে এসেছে। কোনো স্লোগান নয়, কোনো উন্মাদনা নয়—শুধু মাথা নত করা সম্মান আর নিঃশব্দ দোয়া।
এই জানাজা প্রমাণ করে দিল—ক্ষমতা সময়ের সাথে বদলায়, কিন্তু স্মৃতি বদলায় না।
রাজনীতি ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে গেঁথে থাকা নাম কখনো মুছে যায় না। আজ যে বিপুল জনস্রোত দেখা গেল, তা কোনো নির্দেশে আসেনি; এসেছে টান থেকে—এক অদৃশ্য টান, যা ইতিহাসের মানুষদের চারপাশে তৈরি হয়।
ঢাকার আকাশ আজ ভারী ছিল। বাতাসেও ছিল শোকের ওজন। জানাজার তাকবির ভেসে উঠতেই লক্ষ মানুষের বুক একসাথে কেঁপে ওঠে—সেই মুহূর্তে যেন পুরো দেশ এক কাতারে দাঁড়িয়ে যায়। এটি ছিল শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ছিল এক জাতির সম্মিলিত দীর্ঘশ্বাস।
আজকের এই বিদায় তাই কেবল একটি মৃত্যুসংবাদ নয়।
এটি একটি যুগের শেষ বাক্য।
এটি ইতিহাসের পাতায় লেখা এক আগুনঝরা অধ্যায়—
যেখানে মানুষের উপস্থিতিই বলে দেয়,
কে কেবল নেতা ছিলেন, আর কে হয়ে উঠেছিলেন ইতিহাস।
বিদায় মানে শেষ নয়।
বিদায় মানে মানুষের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে যাওয়া।
সম্পাদক : বাতেনুজ্জামান জুয়েল
Copyright © 2025 দেশবাংলা সংবাদ All rights reserved.