বাতেনুজ্জামান জুয়েল :
আজ ১ জানুয়ারি ২০২৬।
আমরা যাকে সহজে বলি— নতুন সাল।
কিন্তু একটু থামলে বোঝা যায়, এটা আসলে কোনো সাধারণ “সাল” নয়।
এটা খ্রিস্টাব্দ—একটি সভ্যতার সময়-দর্শন, একটি বিশ্বাসের ছাপ, ইতিহাসকে গুনে রাখার এক বৈশ্বিক চুক্তি।
এই তারিখ কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় লেখা একটি সংখ্যা নয়।
এটা মানুষের স্মৃতি, ক্ষমতা, ধর্ম, রাজনীতি আর সভ্যতার দীর্ঘ টানাপোড়েনের ফল।
সময় কি নিজে নিজে জন্মায়?
সময় জন্মায় না—
সময়কে মানুষ তৈরি করে।
প্রাচীন পৃথিবীতে সময় ছিল বিচ্ছিন্ন।
কেউ সময় গুনত রাজাদের শাসন ধরে,
কেউ চাঁদের ওঠানামা দেখে,
কেউ আবার ঋতুর হিসাব ধরে।
কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই—
সময় ছিল একেক জনের কাছে একেক রকম।
এক সভ্যতার সময় আরেক সভ্যতার কাছে অর্থহীন।
এই বিভ্রান্তির মাঝেই ইতিহাসে এক ব্যক্তির জন্ম হলো—
যিশু খ্রিস্ট।
যিশু খ্রিস্ট ও সময়ের কেন্দ্রবিন্দু
যিশু খ্রিস্টের জন্মকে কেন্দ্র করে সময়কে ভাগ করার ধারণা প্রথম আসে অনেক পরে।
খ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৫০০ বছর পর,
৫২৫ খ্রিস্টাব্দে
এক খ্রিস্টান সন্ন্যাসী—ডায়োনিসিয়াস এক্সিগুয়াস
সময় গণনার এক নতুন প্রস্তাব দিলেন।
তিনি বললেন—
“সময় গণনা হবে কোনো সম্রাটের ক্ষমতা দিয়ে নয়,
একটি জন্ম দিয়ে—যে জন্ম মানবজাতিকে নতুন নৈতিক বোধ দিয়েছে।”
এইভাবেই জন্ম নেয় Anno Domini (AD)—
অর্থাৎ “প্রভুর বর্ষ”।
আর তার আগের সময় হয়ে যায় খ্রিস্টপূর্ব (BC)।
একজন মানুষের জন্ম হয়ে উঠল গোটা বিশ্বের সময়রেখার কেন্দ্র।
১ জানুয়ারি কেন বছরের প্রথম দিন?
এখানেই আসে আরেক ইতিহাস।
১ জানুয়ারি যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন নয়।
তবুও এই দিনটি বছরের প্রথম দিন কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে রোমান সভ্যতায়।
রোমানরা জানুয়ারি মাসের নামকরণ করেছিল দেবতা Janus-এর নামে—
যিনি অতীত ও ভবিষ্যতের দেবতা।
তার দুটি মুখ—
একটি পেছনের দিকে তাকানো,
অন্যটি সামনে।
এই প্রতীকই ১ জানুয়ারিকে বানিয়েছে— পুরোনো সময়কে বিদায় জানানো আর নতুন সময়ের দরজা খোলার দিন।

পরে ১৫৮২ সালে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু হলে
এই দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে নতুন বছরের সূচনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
এটা কি ধর্মীয় উৎসব?
না।
১ জানুয়ারি মূলত কোনো ধর্মীয় উৎসব নয়।
এটা একটি সভ্যতাগত সমঝোতা।
বিশ্বের মুসলমান আজও হিজরি সন মানেন,
হিন্দুর আছে শকাব্দ ও বঙ্গাব্দ,
বৌদ্ধদের আছে বুদ্ধাব্দ।
তবুও রাষ্ট্র, আদালত, শিক্ষা, বিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—
সবখানে ব্যবহৃত হয় খ্রিস্টাব্দ।
কারণ আধুনিক বিশ্ব বুঝেছে—
একটি অভিন্ন সময় ছাড়া সভ্যতা চলতে পারে না।
খ্রিস্টাব্দ: ক্ষমতার ভাষা, না মানবতার দলিল?
খ্রিস্টাব্দকে অনেকেই পশ্চিমা আধিপত্যের প্রতীক মনে করেন।
এই বিতর্ক অমূলক নয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—
আজ খ্রিস্টাব্দ আর কোনো ধর্মের একক সম্পত্তি নয়।
এটা হয়ে উঠেছে মানব সভ্যতার যোগাযোগের ভাষা।
এই সময়রেখার ওপর দাঁড়িয়েই—
যুদ্ধের তারিখ লেখা হয়
শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়
বিজ্ঞান আবিষ্কারের ইতিহাস রচিত হয়
মানুষের সুখ-দুঃখ নথিভুক্ত হয়
সাহিত্যের চোখে ১ জানুয়ারি
সাহিত্যে ১ জানুয়ারি কখনো আতশবাজি নয়,
এটা এক ধরনের নীরব আত্মজিজ্ঞাসা।
এই দিনে মানুষ হিসাব করে— আমি কী ছিলাম,
আমি কী হতে পারলাম না,
আর সামনে আমি কী হতে চাই।
নতুন বছর মানে নতুন মানুষ হওয়া নয়—
নতুন বছর মানে পুরোনো ভুলগুলোকে চিনে ফেলা।
শেষ কথা
তাই আজ ১ জানুয়ারি ২০২৬—
এটা শুধু একটি নতুন বছরের প্রথম দিন নয়।
এটা মানুষের সেই দীর্ঘ প্রয়াসের স্মারক—
যেখানে মানুষ সময়কে ধরতে চেয়েছে,
ইতিহাসকে নাম দিতে চেয়েছে,
আর নিজের অস্তিত্বকে সংখ্যায় বেঁধে রাখতে চেয়েছে।
সময় চলে যায়,
কিন্তু মানুষ সময়কে রেখে যায়—
ক্যালেন্ডারের পাতায়,
ইতিহাসের বইয়ে,
আর স্মৃতির ভাঁজে।
খ্রিস্টাব্দ তাই কোনো সাল নয়—
এটা মানুষের স্মরণ করার এক বৈশ্বিক ভাষা।
সম্পাদক : বাতেনুজ্জামান জুয়েল
Copyright © 2025 দেশবাংলা সংবাদ All rights reserved.