মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
পঞ্চগড়ে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে মাসব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধন স্বচ্ছতা ও দক্ষতায় মাদ্রাসা পরিচালনায় অঙ্গীকারবদ্ধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোখলেসুর রহমান লোহাগাড়ায় বিভিন্ন পূজামন্ডপ পরিদর্শনে ওসি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ কুড়িগ্রাম সদরে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে জেলা প্রশাসক ও বিএনপি নেতারা পঞ্চগড়ে ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি: মনিটরিং কমিটির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ নাশকতার আশঙ্কা নেই, তবে গুজব ছড়ালে আইনি ব্যবস্থা’— পঞ্চগড়ে এসআরবি কমান্ডার আসন্ন শিরখাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হিসেব জনগণের সমর্থন পেয়ে শীর্ষে আছেন সাবেক চেয়ারম্যান পুত্র জনাব সবুজ বাঘা ঘোগাদহের উন্নয়নে আস্থার প্রতীক চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক, মাদ্রাসার ভবন নির্মাণে দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ লোহাগাড়ায় দুর্গাপূজায় প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিবের উপহার ও আর্থিক অনুদান বিতরণ আওয়ামী লীগের দুর্নীতিতেই জ্বালানি সংকট: পঞ্চগড়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের লিফলেট বিতরণ

লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার দুঃসাহসিক যাত্রা : মাদারীপুরের তরুণদের স্বপ্ন ও মৃত্যুর মাঝের সরু সেতু

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৪১৬ Time View

বাতেনুজ্জামান জুয়েল

মাদারীপুরের বিস্তীর্ণ মাঠ, সরু খাল, সবুজের ঢেউ ছুঁয়ে থাকা গ্রাম—এই অঞ্চলের মানুষ বরাবরই স্বপ্নবান, পরিশ্রমী। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই জেলায় এক অদ্ভুত পরিবর্তনের ঢেউ নেমে এসেছে। পড়ালেখা শেষ না করেই, দক্ষতা না অর্জন করেই, অনেক তরুণ জীবনের সব সঞ্চয় আর স্বপ্ন জড়িয়ে পা বাড়াচ্ছে এক বিপজ্জনক পথে—লিবিয়া হয়ে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার মৃত্যুযাত্রায়।

যারা একদিন স্কুলের খাতা খুলে ভবিষ্যতের রঙিন ছবি আঁকত, তারা আজ দালালের প্রলোভনে সব ছেড়ে মরুভূমির বালুঝড়ে হারিয়ে যাওয়ার পথে হাঁটছে…
মাদারীপুর এমন কত গল্প দেখেছে, কত অশ্রু শুনেছে—তার হিসাব কেউ রাখে না।

—

স্বপ্নের ভিত—নাকি স্বপ্নভঙ্গের শুরু?

মাদারীপুরের অনেক গ্রামেই এখন একটি অব্যক্ত প্রতিযোগিতা—
“কে আগে ইতালি যাবে?”
“কে বিদেশ থেকে বেশি টাকা পাঠাবে?”

অনেক তরুণ মনে করে জীবন বদলের একমাত্র পথ হলো ইউরোপ।
চাষের জমি বন্ধক রেখে, ঋণ নিয়ে, বাড়ির গয়নাগাটি বিক্রি করে পরিবার তাকে বিদেশের পথে পাঠায়। ভাবনা—“ও পৌঁছালেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”

কিন্তু বাস্তবতা কি এত সহজ?

—

মরুভূমি, বন্দিশালা আর অন্ধকার নৌযাত্রা

লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথ যেন জীবনের সবচেয়ে নির্মম পরীক্ষার নাম।

১) সাহারার আগুনে পুড়তে পুড়তে—

মরুভূমি পাড়ি দেয়ার পথে কেউ কেউ তীব্র তৃষ্ণায় প্রাণ হারায়। বালুর ঝড়ে পথ হারিয়ে অনেক তরুণের জীবন থেমে যায় অচেনা বালুকণায়।

২) দালালের ট্র্যাপে আটকে—

লিবিয়ার মানবপাচারকারীরা মাদারীপুরসহ বাংলাদেশের অসংখ্য তরুণকে আটকে রাখে অমানুষিক নির্যাতনে।
অনেকে পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ দাবি করে—না দিলে খাবারও দেয়া হয় না।

৩) ভূমধ্যসাগরের বুকে শেষ নিঃশ্বাস—

ইতালি যাওয়ার নৌকা সামান্য ঝড়ে ভেঙে যায়।
সাগরের বিশাল ঢেউ যেন গিলে নেয় অগণিত নামহীন স্বপ্ন।
মাদারীপুরের অনেক মা আজও অপেক্ষায় আছেন সেই ছেলের জন্য—যে আর কোনোদিন ঘরে ফিরেনি।

—

কেন মাদারীপুরে এই প্রবণতা বেশি?

১) সামাজিক তুলনার চাপ

একজন বিদেশ গেলে পুরো গ্রামে আলোচনার ঝড় ওঠে।
“ওর ছেলে তো ইতালি গেছে, আমাদেরও পাঠাতে হবে।”
এই মানসিকতা তরুণদের ওপর ভয়াবহ চাপ তৈরি করে।

২) দালাল চক্রের সক্রিয়তা

মাদারীপুরে দীর্ঘদিন ধরে সংগঠিত দালাল চক্র কাজ করছে। তারা গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের কাছে বিদেশযাত্রাকে “নিশ্চিত স্বপ্ন” হিসেবে বিক্রি করে।

৩) শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ

পড়ালেখায় মধ্যম রেজাল্ট বা সুযোগের অভাবে অনেক তরুণ মনে করে বিদেশই শেষ ভরসা।
“এখানে কি করবো? বিদেশ গেলে কিছু একটা হবো”—এই ভুল ধারণাই সর্বনাশের শুরু।

—

পড়ালেখা বাদ দিয়ে অবৈধ পথে যাওয়ার পরিণতি

জীবনের অর্থ হারিয়ে যায়

যে তরুণ একটু পরিশ্রম করলে দেশে দক্ষতা অর্জন করে ভালো চাকরি পেতে পারতো—সে আজ বন্দিশালায়, মরুভূমিতে, কিংবা অচেনা সাগরের তলায় হারিয়ে যাচ্ছে।

পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার

সংসারের সর্বস্ব বিক্রি করে ছেলেকে পাঠানো পরিবারগুলো আজ ঋণ আর হতাশায় ডুবে আছে।

সমাজে অস্থিরতা বাড়ে

গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ভয়, ক্ষোভ, হতাশা, আর দালালদের ভয়ে শঙ্কা।

—

মাদারীপুরের তরুণদের জন্য আলোর দিশা

১) দক্ষতা অর্জনই সাফল্যের সবচেয়ে নিরাপদ পথ

যেমন—আইটি, নার্সিং, ইলেকট্রিশিয়ান, গাড়ি মেকানিক্স, ওয়েল্ডিং, হসপিটালিটি, ফ্রিল্যান্সিং ইত্যাদি।
এই দক্ষতায় বৈধভাবে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া—সব জায়গায় সুযোগ আছে।

২) পরিবারকে সচেতন করা জরুরি

দালালের মিথ্যা আশ্বাস মানেই বিপদ।
কাগজপত্র ছাড়া কেউ বিদেশ যেতে পারে না—এটি সবাইকে বুঝতে হবে।

৩) প্রশাসনের কঠোর নজরদারি

দালাল চক্রকে আইনের আওতায় আনা হলে বহু তরুণ বাঁচবে।

৪) দেশে কর্মসংস্থান বাড়ানো

তরুণদের সুযোগ দিলে তারা সীমাহীন প্রতিভা দিয়ে দেশেই উন্নতি করতে পারবে।

—

শেষ কথা

ইতালি যাওয়া খারাপ নয়—
খারাপ হলো অবৈধ পথ, যেখানে নিশ্চিত কিছু নেই; কিন্তু মৃত্যু, নির্যাতন, প্রতারণা নিশ্চিত।

মাদারীপুরের প্রতিটি তরুণের জীবনে আলো ফুটুক বৈধ পথে, দক্ষতা ও শিক্ষার শক্তিতে।
জীবন কোনো দালালের অন্ধকার ঘরে বিক্রি করার মতো নয়।
বিদেশের স্বপ্ন হোক নিরাপদ, পরিকল্পিত, বৈধ—
আর অবৈধ পথ হোক সবার কাছে শোক আর অনুশোচনার গল্প, নতুন স্বপ্নের না।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category