
বাতেনুজ্জামান জুয়েল
— শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক জরুরি ডাক।
বছর ঘুরে ঋতুর পালাবদলে বাংলাদেশ যেমন বদলায়, তেমনি বদলায় আমাদের মানুষের জীবনযাপন, অভ্যাস, আর আনন্দ-বিনোদনের রূপ। কিন্তু এই বদলের ভিড়ে এমন কিছু মূল্যবান সম্পদ—সংস্কৃতি, লোকাচার ও গ্রামীণ খেলাধুলা—আছড়ে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের অতলে। এগুলো হয়তো ইতিহাসের পাতা হয়ে যাবে কোনো একদিন, যদি আমরা এখনই তাদের হাত ধরে না রাখি।
এক সময়ের হাসিমাখা মাঠ আজ নীরব
একসময় গ্রামবাংলার মাঠ মানেই ছিল অপরূপ এক হুল্লোড়।
হেমন্তের বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে মাঠভরা ছেলেদের হুংকারে ভেসে আসতো—
“দাড়ি… বা… ন্দা…!”
তারপর শুরু হতো দলবদ্ধ দৌড়ঝাঁপ, হাসাহাসি, গায়ে ধুলো লাগা অথচ প্রাণের হাসি ভরা খেলাধুলা।
গোল্লাছুট, লাঠিখেলা, কানামাছি, হাডুডু, বউচোর, কাবাডি—এগুলোর প্রতিটিই ছিল কেবল খেলা নয়, গ্রামীণ জীবনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণচাঞ্চল্য।
আজ সেই মাঠ খুঁজে পাওয়া দায়। চৌহদ্দিতে দালান, গৃহস্থালির গাছপালা, কিংবা ফসলের বোঝা—যেখানে একসময় শিশুদের দৌড়ঝাঁপ ছিল, সেখানে আজ নীরবতার কুয়াশা।
সংস্কৃতি ছিল যে সমাজের অক্সিজেন
বাংলার লোকসংস্কৃতি ছিল গ্রামের প্রাণ।
• জারিগান
• পালাগান
• বাউল গান
• ভাটিয়ালি
• কবিগান
• নবান্ন
• পিঠা উৎসব
—এসব উৎসব ও গানের মেলবন্ধন মানুষকে শুধু বিনোদন দিত না; তাদের একতাবদ্ধ করত, একসূতোয় বাঁধত।
একসময় শীত এলে উঠোনময় পিঠার ঘ্রাণ ভেসে বেড়াত।
বিয়েবাড়িতে আলপনা আঁকার ধুম, কীর্তনের সুরে ভোর হওয়া, কিংবা বৈশাখীর মেলায় কাঁচা বাঁশের বাঁশি—এসব আজ কেবল স্মৃতি।
মোবাইল-ইন্টারনেটের আলোতে ঢেকে গেছে সেই দীপশিখার মতো নিবিড় আনন্দ।
হারিয়ে যাওয়ার কারণগুলোও স্পষ্ট
১) প্রযুক্তিনির্ভরতা — শিশুরা মাঠ ছেড়ে বসেছে স্ক্রিনের সামনে।
২) মাঠ দখল — খেলার জন্য উন্মুক্ত স্থান কমে গেছে ভয়াবহভাবে।
৩) অর্থনৈতিক চাপ — পরিবারগুলো আনন্দ-উৎসব থেকে সরে গেছে ব্যস্ততার কারণে।
৪) শহুরে জীবনধারার প্রভাব — গ্রামেও এখন কৃত্রিম বিনোদনের আধিপত্য।
৫) উদ্যোগের অভাব — স্থানীয় প্রশাসন বা সমাজের তরফে পুনরুজ্জীবনের প্রচেষ্টা নেই বললেই চলে।
এসবের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে এক সম্পূর্ণ প্রজন্মের শৈশব, হারিয়ে যাচ্ছে বাংলা সংস্কৃতির মণি-মুক্তা।
গ্রাম হারালে আমরা হারাই নিজের পরিচয়
সংস্কৃতি শুধু বিনোদন নয়—এটি পরিচয়, এটি শেকড়।
একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখে তার স্মৃতি, তার ঐতিহ্য, তার রীতিনীতির স্থায়িত্ব।
যে শিশু গোল্লাছুটের ধুলোয় লুটোপুটি খেয়ে বড় হয়, সে বড় হয়ে সমাজকে ভালোবাসতে শেখে;
যে শিশু কানামাছির খেলায় বন্ধুদের খুঁজে পায়, সে জীবনের অন্ধকারেও আলো খুঁজতে শেখে।
আর যে শিশু কেবল স্ক্রিনে বন্দী—
তার চোখে থাকে আলো, কিন্তু হৃদয়ে থাকে বিচ্ছিন্নতার অন্ধকার।
ফিরে পাওয়া সম্ভব—যদি আমরা চাই
হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন—
✔ গ্রামে নিয়মিত লোকখেলার উৎসব আয়োজন
✔ স্কুল-কলেজের মাঠে কাবাডি, গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্দা বাধ্যতামূলক করা
✔ ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পর্যায়ে লোকসংস্কৃতি মেলা চালু
✔ স্থানীয় শিল্পীদের সহযোগিতা
✔ মিডিয়ায় গ্রামীণ খেলাধুলার প্রচার
✔ শিশুদের মাঠে যাওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি
সংস্কৃতি নিজে নিজে বাঁচে না—তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হয় মানুষের ভালোবাসা দিয়ে।
শেষ কথা
সময়ের স্রোত থেমে থাকে না।
কিন্তু কিছু জিনিস আছে, যেগুলো হারিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না—
যেমন শৈশবের মাঠ, যেমন বাউলের সুর, যেমন নবান্নের প্রথম ধানের গন্ধ।
আজ তাই জরুরি—গ্রামীণ হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি আর খেলাধুলাকে বাঁচিয়ে রাখা,
তাদের নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়া,
যাতে তারা জানে—
এই বাংলাদেশের শেকড় কত গভীর, কত সুন্দর, কত আলোয় ভরা।
Leave a Reply