বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:৫২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
দেবীচরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ESDO-ECE প্রকল্পের উদ্যোগে মা সমাবেশ ও অভিভাবক সভা অনুষ্ঠিত মুমিনবাড়ী ফয়জুল উলুম কওমী মাদ্রাসা ও এতিমখানার জামাতে জালালাইন এর শিক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা ২০২৬ মোহনগঞ্জে প্রবীণ হাফেজ সৈয়দ আহমদ সাহেবের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া হলোখানা ইউনিয়নের উন্নয়নের কাণ্ডারি চেয়ারম্যান রেজাউল করিম: বদলে যাচ্ছে জনপদ নেত্রকোনার খালিয়াজুরিতে বিএনপির ৫ নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও জলমহাল দখলের অভিযোগ উঠেছে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ–২০২৬ রাজৈরের শিক্ষাঙ্গনে গর্বের আলো—শ্রেষ্ঠ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ ফজলুল হক: মাদারীপুরে রক্তাক্ত সকাল—ঢাকা–বরিশাল মহাসড়কে তিন প্রাণহানি মোহনগঞ্জে প্রকাশ্যে মাদক সেবনের দ্বায়ে আটক-৪। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড। সঠিক শিক্ষা ও যত্ন পেলে বধির শিশুরাও যোগ্য নাগরিক হয়ে উঠবে

খাবারের নামে মৃত্যু: একটি জাতির নীরব আত্মহত্যা

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৬৯ Time View

বাতেনুজ্জামান জুয়েল

“আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান”—
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পঙ্‌ক্তি ছিল একদিন আত্মবেদনাময় কবিতার উচ্চারণ। আজ এই পঙ্‌ক্তি আর কাব্য নয়—এটি আমাদের সমাজের স্বীকারোক্তি। পার্থক্য কেবল এই যে, এখানে বিষ পান করছে কোনো একাকী মানুষ নয়; বিষ পান করছে আমাদের শিশুরা। আর আমরা—জেনে শুনেই—তাদের সেই বিষের পাত্র এগিয়ে দিচ্ছি।
একটি শিশুর হাতে যখন দুধের গ্লাস তুলে দেওয়া হয়, তখন সেটি শুধু দুধ নয়—তা হয়ে উঠতে পারে ধীরে ধীরে জমে ওঠা মৃত্যুর তরল। একটি ফল যখন শিশুর মুখে দেওয়া হয়, তার উজ্জ্বল রঙ চোখে আনন্দ দিলেও ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে বিষাক্ত ফরমালিন। রঙিন চিপস, চকলেট, আইসক্রিম—যেগুলো শিশুদের আনন্দের প্রতীক—সেগুলোই নীরবে ভেঙে দিচ্ছে তাদের শরীরের ভিত।
শিশু জানে না।
কিন্তু আমরা জানি।
রাষ্ট্র জানে।
সমাজ জানে।
তবু আমরা চুপ।
এই নীরবতাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর তালিকায় অপুষ্টি, ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, কিডনি ও লিভারের রোগ নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই রোগগুলোর উৎস কোথায়—সে প্রশ্নটি আমরা বারবার এড়িয়ে যাই। চিকিৎসকেরা বলছেন, ভেজাল খাদ্য শিশুদের শরীরে বিষের স্তূপ জমাচ্ছে। সেই বিষ একদিন হঠাৎ আঘাত হানে—কখনো কিডনিতে, কখনো লিভারে, কখনো স্নায়ুতন্ত্রে। তখন চিকিৎসা থাকে, কিন্তু সময় থাকে না।
শিশুর শরীর কাঁচের মতো। অল্প আঘাতেই ফেটে যায়। ফরমালিনযুক্ত ফল কিডনিকে নিঃশব্দে ক্ষয় করে, ভেজাল দুধ লিভারের ভিত নষ্ট করে, শিল্প রং ও রাসায়নিক উপাদান শিশুর মস্তিষ্কে অদৃশ্য ক্ষত তৈরি করে। তার ফল দেখা যায় ধীরে—খিঁচুনি, শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী ডায়রিয়া, মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা, আর শেষ পর্যন্ত অকাল মৃত্যু।
এই মৃত্যু কি দুর্ঘটনা?
না।
এটি পরিকল্পিত অবহেলার ফল।
কারণ কেউ জানে না—এ কথা বলা যাবে না। সবাই জানে। তবু প্রশ্ন তোলা হয় না। দায় নির্ধারণ করা হয় না। কারণ দায় নির্ধারণ মানেই মুখোশ খোলা। আর সেই মুখোশের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে প্রভাব, ক্ষমতা আর টাকার পাহাড়।
প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু মারা যায়। পরিসংখ্যান হয়। সংবাদ হয়। তারপর সব ভুলে যাওয়া হয়। কেউ হিসাব রাখে না—এই শিশুগুলো কতটা ভেজাল খাদ্যের শিকার ছিল। কারণ সেই হিসাব করলে আমাদের আয়নায় তাকাতে হবে। আমরা সেই আয়নায় তাকাতে ভয় পাই।
ভেজাল খাদ্য শুধু শিশুদের শরীর কেড়ে নিচ্ছে না—কেড়ে নিচ্ছে একটি জাতির ভবিষ্যৎ। আজ যে শিশু ভেজাল খাবার খেয়ে বড় হচ্ছে, সে আগামী দিনে হবে দুর্বল, অসুস্থ, মনোযোগহীন। একটি অসুস্থ প্রজন্ম দিয়ে কোনো দেশ এগোতে পারে না। উন্নয়নের সব স্লোগান তখন কেবল শব্দ হয়ে থাকে—ভিতরে ফাঁপা।
আইন আছে, খাদ্য নিরাপত্তা আইন আছে, অভিযান আছে। কিন্তু নিরাপদ খাবার নেই। মাঝেমধ্যে কিছু ছোট অপরাধীরা ধরা পড়ে। বড় বিষকারখানাগুলো থেকে যায় অদৃশ্য। প্রশ্ন থেকেই যায়—কারা এই বিষ বানাচ্ছে? কারা বাজারে ছাড়ছে? তাদের নাম প্রকাশ পায় না কেন?
ভেজাল খাদ্য আজ আর শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়। এটি একটি নৈতিক বিপর্যয়। একটি সমাজ কতটা অমানবিক হলে শিশুদের খাবারে বিষ মেশাতে পারে—এই প্রশ্নই আজ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
রবীন্দ্রনাথের সেই পঙ্‌ক্তি আজ আর কাব্যের সৌন্দর্য নয়—এটি আমাদের সমাজের আয়না।
আমরা জেনে শুনেই বিষ করাচ্ছি পান—আমাদের শিশুদের দিয়ে।
আজ যদি আমরা প্রশ্ন না তুলি, আজ যদি আমরা কঠোর না হই, আজ যদি আমরা এই বিষচক্র ভাঙতে না পারি—তবে আগামী দিনে প্রতিটি শিশুর মৃত্যু আমাদের নীরবতার দলিল হয়ে থাকবে।
কারণ কিছু অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য।
আর শিশুদের খাবারে বিষ—তার মধ্যে অন্যতম।
শেষে ৫টি বজ্রাঘাত প্রশ্ন
আমরা কি জেনে শুনেই শিশুদের মৃত্যু বিক্রি করছি—খাবারে বিষ মেশানোর মাধ্যমে?
বড় ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীলরা কি এই শিশুর মৃত্যুকে শুধু পরিসংখ্যান মনে করছেন?
আমরা কি নিজের স্বার্থের জন্য নীরব থেকে শিশুদের অধিকার চুরি করছি?
যদি আমরা আজ প্রতিবাদ না করি, আগামী প্রজন্ম কি আমাদের নীরবতার মূল্য দিতে হবে তাদের প্রাণ দিয়ে?
কতদিন আমরা এই নীরবতা চালাবো, যতক্ষণ শিশুরা আমাদের অবহেলায় বিষ খাচ্ছে?

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category