
বাতেনুজ্জামান জুয়েল ::
রমজান—একটি মাসের নাম, অথচ অনুভূতিতে যেন এক অনন্ত আকাশের বিস্তার। আরবি “রমদ” ধাতু থেকে উদ্ভূত এই শব্দের অর্থ দহন; কিন্তু এ দহন আগুনের নয়, পাপের—অহংকার, লোভ, হিংসা আর অশুদ্ধতার দহন। এই মাসে নেমে আসে রহমত, বরকত আর নাজাতের স্নিগ্ধ বৃষ্টি। তাই রমজান শুধু ক্যালেন্ডারের একটি অধ্যায় নয়; এটি আত্মার পুনর্জন্মের ঋতু।
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি রোজা। পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর—যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” এই তাকওয়া হলো অন্তরের এক দীপ্ত শিখা, যা মানুষকে অন্ধকার পথ থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়। রমজান সেই আলোর দিশারী, যে মানুষকে নিজেকে জানার শিক্ষা দেয়।
এই মাসেই অবতীর্ণ হয়েছিল মহাগ্রন্থ কুরআন—মানবতার হেদায়েত, সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী মানদণ্ড। লাইলাতুল কদরের পবিত্র রজনী যেন আকাশের নক্ষত্রের চেয়েও উজ্জ্বল; এক রাত, যার ইবাদত হাজার মাসের চেয়েও শ্রেয়। সে রাত নীরব, অথচ হৃদয়ের ভেতর অনুরণিত হয় অদৃশ্য সুর—ক্ষমা, প্রার্থনা আর আত্মসমর্পণের। মনে হয়, আকাশের দরজাগুলো খুলে গেছে, আর করুণা নেমে আসছে নিরবধি।
রমজান আমাদের শেখায় সংযমের ভাষা। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা কেবল দেহের সাধনা নয়, এটি আত্মারও অনুশীলন। যখন ক্ষুধা পেটে কাঁপন তোলে, তখন মনে পড়ে যায় অভাবী মানুষের কথা। তখন সহমর্মিতা জন্ম নেয়, দানের হাত প্রসারিত হয়। যাকাত, সদকা আর ফিতরার মাধ্যমে সমাজে গড়ে ওঠে ভ্রাতৃত্বের সেতু। ধনী-গরিবের ব্যবধান কমে আসে মানবিকতার উষ্ণতায়।
এই মাস যেন ধৈর্যের বিদ্যালয়। রাগ সংযত করা, চোখকে সংযত রাখা, জিহ্বাকে মিথ্যা ও কটু বাক্য থেকে বিরত রাখা—এসবই রোজার প্রকৃত শিক্ষা। রোজা শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়; এটি হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করা, চরিত্রকে শুদ্ধ করা, মনকে আলোকিত করা। রমজান মানুষকে বাহ্যিক আচার থেকে অন্তরের ইবাদতে নিয়ে যায়।
রমজানের সেহরি যেন প্রভাতের আগে এক পবিত্র আহ্বান; নিদ্রিত পৃথিবী তখনও অন্ধকারে আচ্ছন্ন, অথচ মুমিনের ঘরে জ্বলে ওঠে আলো। নিস্তব্ধতার মাঝে উচ্চারিত হয় দোয়া, মৃদু স্বরে তিলাওয়াত, আর কৃতজ্ঞতার সুর। আর ইফতারের সময়, সূর্য যখন অস্ত যায়, আকাশ রাঙা হয়ে ওঠে কৃতজ্ঞতার রঙে। এক ফোঁটা পানিতে, এক টুকরো খেজুরে মিশে থাকে অপার তৃপ্তি—কারণ তা স্রষ্টার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিবেদিত।
রাতের তারাবির নামাজে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো মানুষ যেন একতার প্রতীক। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সব বিভেদ মুছে গিয়ে সবাই এক কাতারে দাঁড়ায়। এ দৃশ্য আমাদের শেখায়—মানুষের আসল পরিচয় তার সম্পদ নয়, তার বিনয়। গভীর রাতে তাহাজ্জুদের সিজদায় যখন অশ্রু ঝরে, তখন হৃদয় হালকা হয়ে যায়; মনে হয়, সব গ্লানি ধুয়ে গেছে।
রমজান প্রকৃতপক্ষে ভালোবাসার মাস—স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, ন্যায় ও সত্যের প্রতি ভালোবাসা। এই মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু সৎকর্মের আলো চিরস্থায়ী। যদি রমজানের শিক্ষাকে আমরা বছরের প্রতিটি দিনে ধারণ করতে পারি, তবে আমাদের চরিত্র হবে নির্মল, সমাজ হবে শান্তিময়, আর পৃথিবী হবে আরও সহমর্মিতার আবাস।
শেষে বলা যায়, রমজান হলো অন্তরের বিপ্লব—নীরব, অথচ গভীর। এ মাস আমাদের শেখায়, অন্ধকার যতই ঘন হোক, একটুকরো আলোই যথেষ্ট পথ দেখাতে। আর সেই আলোর নাম—রমজান; আত্মার আকাশে জ্বলে থাকা এক অনন্ত প্রদীপ।
Leave a Reply