

সময়ের স্রোত বয়ে চলে নিজের নিয়মে। প্রজন্ম বদলায়, সমাজ এগিয়ে যায়, স্বপ্নের রংও পাল্টায়। কিন্তু এই অগ্রগতির পথেই কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে কিছু অন্ধকার ছায়া—যাদের অস্তিত্ব দেখা যায় না চোখে, কিন্তু অনুভব করা যায় প্রতিটি ব্যর্থ ভবিষ্যৎ, প্রতিটি অকাল ম্লান হয়ে যাওয়া হাসির ভেতরে। বাল্যবিবাহ তেমনই এক অদৃশ্য, অথচ ভয়ংকর হুমকি—যা এক দিকে শিশুর জীবনের সম্ভাবনাকে থামিয়ে দেয়, অন্য দিকে দেশের ভবিষ্যতের ওপর নিক্ষেপ করে দীর্ঘ ছায়া।
যে বয়সে শিশুরা দৌড়ে বেড়ায় মাঠে, খেলার ছলে শেখে পৃথিবীর রঙ, সে বয়সে যদি তার হাতে শৈশবের জায়গায় তুলে দেওয়া হয় পরিণত বয়সের দায়িত্ব—তাহলে সে দায়িত্ব কখনোই আশীর্বাদ হয়ে আসে না। বাল্যবিবাহের শেকল একবার কারও গলায় পরলে, সেই শেকল ধীরে ধীরে তার শিক্ষা, স্বপ্ন, মানসিক বেড়ে ওঠা—সবকিছুকেই আটকে ফেলে। শৈশবে বাঁধা পড়া এই মেয়েরা বড় হয়ে যে সমাজে ফিরে আসে, সেখানে তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়, কর্মজীবনে তারা পিছিয়ে থাকে, পরিবারে তারা কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলে।
আর এই নিভে যাওয়া কণ্ঠস্বরই আমাদের ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।
কারণ বাল্যবিবাহ শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়—এটি পুরো জাতির শক্তিকে দুর্বল করে দেয়। অশিক্ষিত, অনভিজ্ঞ ও অপুষ্ট মায়েরা পরবর্তী প্রজন্মকে নিরাপদভাবে বড় করতে পারে না। সমাজ পায় না সেই সক্রিয় নারীশক্তি, যারা অর্থনীতিকে গতিশীল করে, শিক্ষাকে ছড়িয়ে দেয়, সমাজকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। একটি বাল্যবিবাহ মানে সেই পরিবারের স্বপ্নহারা মা; আর সেই মা মানে স্বপ্নহীন একটি প্রজন্ম।
শৈশবকে বিবাহের নামে কবর দিলে অদূর ভবিষ্যতে আমরা দেখতে পাই—অপরিণত বয়সে মাতৃত্বজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি, শিক্ষার হার কমে যাওয়া, দারিদ্র্যের ফাঁদে পুরো পরিবারের আটকে পড়া এবং সবচেয়ে ভয়ংকর—নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধি। এই সামাজিক ক্ষতগুলো বড় হয় ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে, অদৃশ্য বিষের মতো। একদিন হঠাৎ বুঝে যাই—সমাজের আলো নিভে গেছে, কারণ আমরা শৈশবের আলোকে আগেই নিভিয়ে ফেলেছিলাম।
আজ তাই প্রয়োজন কঠোর আইন নয়—প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তন। প্রয়োজন সমাজের প্রতিটি কোণে, প্রতিটি পরিবারে, প্রতিটি অভিভাবকের মনে এই বোধ জাগানো যে, শিশু কোনো গৃহস্থালির বোঝা নয়—সে ভবিষ্যতের আলো, ভবিষ্যতের শক্তি। তার স্বপ্ন দেখা ও বড় হওয়ার অধিকার তার জন্মগত। সেই অধিকার কেড়ে নেয়ার নাম কখনোই নিরাপত্তা হতে পারে না।
আমরা যদি সত্যিই উন্নত দেশের ভবিষ্যৎ চাই, যদি চাই নারী-পুরুষ সমতার পথ প্রশস্ত হোক, যদি চাই আমাদের সন্তানরা আত্মবিশ্বাস ও শিক্ষার আলো নিয়ে বড় হোক—তবে বাল্যবিবাহ বন্ধ করাই হবে প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।
আজ আমরা যে শিশুকে বাল্যবিবাহের দিকে ঠেলে দিচ্ছি, আগামী দিনে সেই শিশুই আমাদের জাতির গতি থামিয়ে দেবে। আর আমরা যে শিশুকে স্বপ্ন দেখতে দিচ্ছি, শিক্ষা দিতে দিচ্ছি, বড় হতে দিচ্ছি—সেই শিশুই একদিন ভবিষ্যতের আলো হয়ে দাঁড়াবে।
শিশুর শৈশব রক্ষা করা মানে শুধু একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা নয়—এটা একটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষা করা।
কারণ বাল্যবিবাহ সত্যিই আমাদের ভবিষ্যতের জন্য এক অদৃশ্য, কিন্তু অত্যন্ত ভয়ংকর হুমকি।
Leave a Reply