
বাতেনুজ্জামান জুয়েল :
তালগাছ এক পায়ে দাড়িয়ে সবগাছ ছাড়িয়ে উকি মারে আকাশে।রবী ঠাকুরের সেই তালগাছ এখন আর নেই।
গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল তালগাছ। বিস্তীর্ণ মাঠের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ তালগাছ যেন আকাশের বুক চিরে উঠে যাওয়া এক নিঃসঙ্গ প্রহরী। ঝড়-বাদলের দিনে গ্রামের মানুষের জীবন বাঁচানো থেকে শুরু করে গরমের দুপুরে ছায়া, ঘরের চালের খুঁটি, লোকসংস্কৃতিতে তালগানের ছন্দ—সবই যেন তালগাছকে ঘিরে ছিল। অথচ আজ এই তালগাছই দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
তালগাছ কমে যাওয়ার কারণ::
বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে তালগাছ কমে যাওয়ার পেছনে প্রধান কিছু কারণ হলো—
১. রাস্তা নির্মাণ ও উন্নয়ন কাজ:
বিভিন্ন মহাসড়ক, গ্রামীণ পাকা রাস্তা ও জনবসতি বৃদ্ধির কারণে ব্যাপক হারে পুরনো তালগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। নতুন গাছ রোপণের বিষয়টি যেন গুরুত্ব পায়নি।
২. প্রাকৃতিক দুর্যোগ:
ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী ও প্রবল বজ্রপাতের কারণে বহু তালগাছ ধ্বংস হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা যায়, অন্যান্য গাছের তুলনায় তালগাছ অপেক্ষাকৃত বেশি বজ্রাপাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩. কৃষিজমির বিস্তার:
চাষাবাদের ক্ষেত বাড়ানোর জন্য ফসলি জমির মাঝে দাঁড়ানো তালগাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। কৃষকেরা মনে করেন, তালগাছ জমিতে ছায়া ফেলে উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।
৪. সচেতনতার অভাব:
গ্রামীণ সমাজে তালগাছের পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার অভাবও তালগাছ নিধনের অন্যতম কারণ।
পরিবেশের জন্য তালগাছ কেন জরুরি::::
তালগাছ শুধু একটি গাছ নয়—এটি একটি পরিবেশরক্ষক।
১. বজ্রপাত থেকে মানুষকে রক্ষা করে
তালগাছ বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করে। খোলা মাঠে তালগাছ থাকলে বজ্রপাতের শক্তি সরাসরি গাছে নেমে যায়, মানুষ নিরাপদ থাকে। তাই অতীতে তালগাছ থাকা এলাকায় বজ্রপাতে মৃত্যুহার কম ছিল।
২. মাটির ক্ষয় রোধ করে
তালগাছের শিকড় মাটিকে ধরে রাখে, ফলে বন্যা বা জমির ক্ষয়ের ঝুঁকি কমে।
৩. জীববৈচিত্র্যের আশ্রয়স্থল
পাখি, কাঠবিড়ালি, মৌমাছি ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র প্রাণীর নিরাপদ আবাস তালগাছ।
৪. খাদ্য হিসেবে গুরুত্ব
তালশাঁস, তালমিছরি, তালপিঠা, তালের রস—এগুলো গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খাবার। তালের রস থেকে গুড় তৈরি হয় যা পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ।
তালগাছ রক্ষায় করণীয়:
তালগাছ রক্ষার জন্য এখনই উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কিছু কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে—
► তালগাছ রোপণ অভিযান চালানো
বিদ্যালয়, কলেজ, ইউনিয়ন পরিষদ ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে যুক্ত করে তালবীজ রোপণ করা দরকার।
► সরকারি প্রকল্পে তাল রোপণ বাধ্যতামূলক করা
রাস্তার পাশে, খাসজমিতে ও সরকারি খোলামাঠে তালগাছ লাগানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
► সচেতনতা বাড়ানো
তালগাছ পরিবেশবান্ধব এবং জীবনরক্ষাকারী গাছ—এ কথা জনগণকে জানাতে হবে।
► বজ্রপাতপ্রবণ এলাকায় তালগাছ সংরক্ষণ
যেসব এলাকায় বজ্রপাত বেশি হয় সেখানে তালগাছের সংখ্যার ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে।
—
পরিশেষে বলা যয় ::
তালগাছ শুধু একটি গাছ নয়, এটি বাংলাদেশের লোকসংস্কৃতি, পরিবেশ ও জীবনের প্রতীক। আমরা যদি এখনই তালগাছ রোপণ ও সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেই, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু বইয়ে তালগাছের কথা পড়বে—বাস্তবে দেখতে পাবে না। তাই পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে এখনই আমাদের এগিয়ে আসতে হবে।
তালগাছ বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে, বাঁচবে আমাদের গ্রামীণ জীবন।
Leave a Reply