নীরব ঘাতকের তিন মুখ :রক্তের ধারা ও হৃদয়ের নীরব সংকেত
Reporter Name
-
Update Time :
রবিবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২৫
-
৯৪
Time View

দেশবাংলা ডেস্ক :
নীরব ঘাতকের তিন মুখ :রক্তের ধারা ও হৃদয়ের নীরব সংকেত।
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ—অবহেলা থেকে বাঁচার আহ্বান।
মানুষের দেহ যেন এক সজীব নদী। রক্ত তার স্রোত, হৃদয় তার নাবিক। এই নদী যতক্ষণ মুক্তভাবে বয়ে চলে, ততক্ষণ জীবন প্রাণবন্ত থাকে। কিন্তু যখন এই স্রোতে অদৃশ্য বাঁধ গড়ে ওঠে—ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা হৃদরোগের নামে—তখন বিপদ শুরু হয়। শুরুতে ঢেউ ছোট, সংকেত ক্ষীণ। আমরা বুঝতে চাই না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঢেউই একদিন জীবনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
এই তিনটি রোগ—ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ—আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে ভয়ংকর নীরব ঘাতক।
এরা শব্দ করে আসে না, সতর্ক ঘণ্টা বাজায় না। অথচ একদিন এসে বলে—এখানেই থামো।
ডায়াবেটিস : মধুর স্বাদে মোড়া তিক্ত পরিণতি:
ডায়াবেটিস কোনো আকস্মিক দুর্যোগ নয়; এটি দীর্ঘদিনের অবহেলার ফসল। একটু বেশি ভাত, একটু বেশি মিষ্টি, আরামপ্রিয় জীবন আর শরীর না নড়ানোর স্বাচ্ছন্দ্য—এই “একটু একটু” মিলেই একদিন রক্তে গ্লুকোজের আগুন জ্বলে ওঠে।
ডায়াবেটিস ধীরে ধীরে সবকিছু কেড়ে নেয়—চোখের আলো ঝাপসা করে, কিডনিকে দুর্বল করে, স্নায়ুকে অবশ করে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫৫ কোটি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, এবং আশঙ্কা করা হচ্ছে আগামী কয়েক দশকে এই সংখ্যা আরও ভয়াবহ আকার নেবে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো—ডায়াবেটিস একা আসে না। সে সঙ্গে করে নিয়ে আসে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি। তাই এই রোগকে অবহেলা করা মানে জীবনকে ধীরে ধীরে বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া।
সচেতনতার পথ:
নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা, চিনি ও পরিশোধিত খাবার কমানো, শাকসবজি ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ এবং প্রতিদিন অন্তত আধাঘণ্টা হাঁটা—এই সাধারণ অভ্যাসগুলোই ডায়াবেটিসের সবচেয়ে শক্ত প্রতিষেধক।
উচ্চ রক্তচাপ : শব্দহীন মৃত্যুদূত
উচ্চ রক্তচাপ এমন এক রোগ, যে কথা বলে না। ব্যথা দেয় না, কষ্ট জানায় না। অথচ নীরবে সে হৃদয়কে ক্লান্ত করে, মস্তিষ্কে স্ট্রোকের পথ তৈরি করে, কিডনিকে নিঃশেষ করে দেয়। বাংলাদেশে প্রায় ২৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এই রোগে আক্রান্ত—অধিকাংশই জানেন না।
“আমার তো কিছু হয় না”—এই বাক্যটিই উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। যখন ধরা পড়ে, তখন ক্ষতির বড় অংশ ইতোমধ্যেই হয়ে যায়।
সচেতনতার পথ
নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, লবণ কমানো, জাঙ্ক ফুড বর্জন, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ—এই সিদ্ধান্তগুলোই নীরব ঘাতকের মুখ বন্ধ করতে পারে।
হৃদরোগ : জীবনের স্পন্দনে হঠাৎ থামা
হৃদয় আমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী। জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সে বিরামহীন কাজ করে যায়। অথচ আমরা তাকেই সবচেয়ে বেশি অবহেলা করি। ধূমপানের ধোঁয়া, অতিরিক্ত তেল-চর্বি, রাতজাগা আর দীর্ঘস্থায়ী দুশ্চিন্তা—এই সব বোঝা বহন করতে করতে একদিন হৃদযন্ত্র থেমে যায়।
হৃদরোগ সবচেয়ে নিষ্ঠুর, কারণ সে দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না। হার্ট অ্যাটাক কোনো ঘোষণা দিয়ে আসে না।ঢাকঢোল পিটিয়ে আসেনা।সে নিরবে লুকিয়ে থাকে আপনার আমার বুকে।তাকে আমরা খুব যতনে বড় হতে সাহায্য করি।অমনি সে শুরু করো
বুকে হালকা ব্যথা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট—এই ক্ষীণ সংকেতগুলো উপেক্ষা করাই অনেক সময় শেষ ভুল হয়ে দাঁড়ায়। দেশে প্রতিবছর লক্ষাধিক মানুষ হৃদরোগজনিত কারণে হাসপাতালে ভর্তি হন—সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য ভাঙা পরিবার।
সচেতনতার পথ:
ধূমপান সম্পূর্ণ বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক শান্তি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ইসিজি ও অন্যান্য পরীক্ষা—এইগুলোই হৃদযন্ত্রকে দীর্ঘদিন সচল রাখে।
তিনটি রোগ, এক শেকড়
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ—আলাদা মনে হলেও এদের শেকড় এক জায়গায়। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় মেটাবোলিক ট্রায়াড। অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অলসতা ও মানসিক চাপ—এই ত্রয়ীর হাত ধরেই নীরব ঘাতকরা শক্তি পায়।
এরা আমাদের শত্রু নয়; এরা আমাদের ভুলের আয়না।
মুক্তির পথ :
অভ্যাস বদলেই প্রতিরোধ
এই রোগগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ কোনো একদিনে জেতা যায় না। কিন্তু প্রতিদিন সচেতন সিদ্ধান্ত নিলে যুদ্ধ জেতা সম্ভব। কম খাওয়া মানে বঞ্চনা নয়, বরং আত্মরক্ষা। হাঁটা মানে সময় নষ্ট নয়, বরং জীবন বাড়ানো। নিয়মিত পরীক্ষা মানে ভয় নয়, বরং সাহস।
শেষ কথা:
আমরা দীর্ঘ জীবন চাই, কিন্তু শৃঙ্খলা চাই না। এই দ্বন্দ্বের মাঝেই জন্ম নেয় নীরব ঘাতকের তিন মুখ। এখনো সময় আছে—থামার, ভাবার, বদলানোর।
অবহেলা নয়—সচেতন জীবনই হোক আমাদের প্রতিরোধ।
সুস্থ জীবন কোনো সৌভাগ্য নয়, এটি সচেতন মানুষের অর্জন।
Please Share This Post in Your Social Media
More News Of This Category
Leave a Reply