সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
মোহনগঞ্জে সড়ক নির্মাণে দীর্ঘসূত্রিতা, নীরব প্রশাসন—মৃত্যুঝুঁকিতে মানুষ আল্লামা ফুলতলী ছাহেব ক্বিবলাহ (রহঃ) মাজার জিয়ারতে দোয়ারাবাজারের নেতৃবৃন্দের সংক্ষিপ্ত সফর খুলনার শিয়ালীতে সনাতন ধর্ম সুরক্ষা পরিষদের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত মাদারীপুরে সংঘবদ্ধ ডাকাতির তাণ্ডব: ৬ স্বর্ণের দোকান লুট ভোররাতে হাউসদী বাজারে হানা, প্রত্যক্ষদর্শীকে বেঁধে নির্যাতন রাজৈরে পুলিশের জালে ইয়াবা কারবারি, উদ্ধার ১৬৫ পিস দোয়ারাবাজার উপজেলা নির্বাচনে আব্দুল বাছিত খানকে আল ইসলাহর পূর্ণ সমর্থন রাঙামাটিতে ৩৪তম নববর্ষ উদযাপন: শোভাযাত্রা ও পান্তা উৎসবে মুখর শহরবাসী শহীদ সরদার সাজাহান গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে বৈশাখের বর্ণাঢ্য উৎসব—পান্তা-ইলিশ, নাচ-গানে মুখর ক্যাম্পাস বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে মাদারীপুরে গীতাপাঠ প্রতিযোগিতা ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত

হারিয়ে যাচ্ছে মাদারিপুরের খেজুরের গুড় : স্মৃতি, স্বাদ আর ভবিষ্যতের এক নিঃশব্দ বিলাপ

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৩১০ Time View

বাতেনুজ্জামান জুয়েল, দেশবাংলা সংবাদ

মাদারিপুরের শীত নামলেই একসময় ভোরের বাতাসে ভেসে আসত ধোঁয়ামাখা মিষ্টি ঘ্রাণ। সে ঘ্রাণ ছিল খেজুরগাছের বুকচেরা রস, আর সেই রসের আগুনে ঘনীভূত মায়াবী রূপ—খেজুরের গুড়। গ্রামের বাড়ি থেকে হাট-বাজার, শীতের পিঠা থেকে অতিথির আপ্যায়ন—সবকিছুই যেন পূর্ণ হতো এই একমুঠো মিষ্টতার ছোঁয়ায়।

কিন্তু সময় বদলেছে। নীরবে, ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে মাদারিপুরের সেই ঐতিহ্যবাহী খেজুরের গুড়। আজ আর ভোরবেলা চারদিক জুড়ে সেই ধোঁয়ার লীলাভূমি দেখা যায় না; রসের হাঁড়ি জ্বালানোর শব্দ নেই, নেই রসকাটা মানুষের উৎসবমুখর ব্যস্ততা।

ঐতিহ্য হারানোর নেপথ্যের গল্প

সবচেয়ে বড় বিপর্যয় এসেছে খেজুরগাছ হারিয়ে যাওয়ায়। এক সময় যে গ্রাম-গঞ্জে খেজুরগাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়াত সারি সারি, আজ সেখানে দেখা যায় পাকা বাড়ি, রাস্তাঘাট আর জমির নতুন ব্যবহার। গাছ কমেছে, রস সংগ্রহের কষ্ট বেড়েছে, আর এ পেশায় থাকা মানুষের সংখ্যা কমে এসেছে।

তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা—অর্থনৈতিক টানাপোড়েন। যাঁরা খেজুর রস সংগ্রহ ও গুড় প্রস্তুতির কাজ করতেন, তাঁরা ছিলেন মূলত স্বল্পআয়ের মানুষ। সময়ের সঙ্গে তারা খুঁজে পেয়েছেন নতুন জীবিকার পথ—বিদেশযাত্রা, দিনমজুরি, নির্মাণশ্রম, অথবা স্থানীয় বিভিন্ন পেশা। এই নতুন কাজগুলোর আয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অনেকেই আর সিজনাল এই শ্রমসাধ্য পেশায় ফিরে আসতে চাইছেন না।

এতে একদিকে গরিব মানুষের কিছুটা অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটেছে, কিন্তু অন্যদিকে হারিয়ে যাচ্ছে একটি অমূল্য ঐতিহ্য—খেজুরের গুড় তৈরির সংস্কৃতি। মানুষের জীবনমান উন্নত হওয়াটা আনন্দের, কিন্তু তার বিনিময়ে গ্রামীণ শিল্পের এমন নিঃশব্দ মৃত্যু হৃদয়ে হাহাকার তোলে বটে।

প্রবাসে যাওয়া ও ঐতিহ্যের শিকড় ছেঁড়া

মাদারিপুরে বিদেশগমন এখন সাধারণ বিষয়। প্রবাসে ভালো আয়ের আশায় অনেকেই গ্রামের পুরোনো পেশাকে বিদায় জানিয়েছেন। এতে পরিবার চলেছে, ঘর-বাড়ি উঠেছে—এ সাফল্যে সন্দেহ নেই। কিন্তু এর আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামের শীতের রূপ, ঘরের রান্নাঘরের ধোঁয়া, আর গাছের কপালে বাঁধা মাটির কলসির ছন্দ।

প্রবাসী পরিবারের ঘরে আজ আর সে রকম ভোর জাগে না—যে ভোরে বাবা-মা রস জ্বালিয়ে গুড় বানাতেন, আর শিশুরা হাঁড়ির পাশে দাঁড়িয়ে স্বাদ নিত ফুটন্ত রসের। মানুষ আছে, স্মৃতি আছে—কিন্তু ঐতিহ্যের হাত ধরার কেউ নেই।

গ্রামীণ শিল্পকে ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা

পরিস্থিতি যত হতাশারই হোক, আশার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি।
– স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরি করা গেলে,
– খেজুরগাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হলে,
– আধুনিক ও স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতিতে গুড় উৎপাদনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে,
মাদারিপুরের এই হারানো মাধুর্য আবারও ফিরে আসতে পারে।

খেজুরের গুড় শুধু একটি খাবার নয়—এটি একটি সংস্কৃতি, একটি ঐতিহ্য, একটি অঞ্চলীয় পরিচয়। যা হারিয়ে গেলে শুধু স্বাদ নয়, হারায় একটি জেলার আত্মার অংশ।

শেষ কথা

আজ যখন শীত আসে, তখন মাদারিপুরের অনেক গ্রামে আর সেই সুবাস ভেসে আসে না। রস জ্বালানোর হাঁড়ি ঠান্ডা, খেজুরগাছের কপালে আর কলসি বাঁধে না। এ যেন সময়ের কাছে ধীরে ধীরে মুছে যাওয়া এক শিল্পের বিলাপ।

তবুও আশায় বুক বাঁধা যায়—একদিন হয়তো আবার ফিরে আসবে সেই শীতের ভোর, যখন গ্রামের আকাশে ধোঁয়ার রেখা উঠবে, আর মানুষ বলবে—“মাদারিপুরের গুড়ের স্বাদই আলাদা।”

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category