
বাতেনুজ্জামান জুয়েল
৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দ। উত্তপ্ত মরুভূমির বুক চিরে ইতিহাসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছে কাজিমা প্রান্তর। এখানে সংঘটিত হয় এক শ্বাসরুদ্ধকর সংঘর্ষ—Battle of Chains—যা আজও বীরত্বের এক অনন্য উপাখ্যান হয়ে আছে।
মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন দুনিয়াজোড়া খ্যাতিমান সেনাপতি খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদ—যাকে ইতিহাস “আল্লাহর তলোয়ার” বলে চেনে। অপরদিকে পারস্য সাম্রাজ্যের গর্ব, শক্তিশালী সেনাপতি হরমুজ, দাঁড়িয়ে ছিলেন অহংকার ও কৌশলের প্রতীক হয়ে।
যুদ্ধের আগে ঘোষণা আসে—দুই বাহিনীর হাজারো সৈন্যের রক্ত ঝরানোর আগে, হোক একক দ্বন্দ্বে নিষ্পত্তি। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন হরমুজ। জবাব দেন খালিদ—নীরব দৃঢ়তায়, নির্ভীক পদক্ষেপে।
দুই বীর এগিয়ে আসেন, যেন ইতিহাস নিজেই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে। মুহূর্তেই শুরু হয় দ্বন্দ্ব—তলোয়ারের ঝলক, ঢালের শব্দ, আর মরুর বাতাসে উত্তেজনার কম্পন।
কিন্তু হরমুজের অন্তরে ছিলো বিশ্বাসঘাতকতার কালো ছায়া। গোপনে লুকিয়ে রাখা সৈন্যদের সে নির্দেশ দেয়—সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে খালিদকে হত্যা করতে।
দ্বন্দ্বের উত্তাপে যখন চারপাশ অগ্নিগর্ভ, ঠিক তখনই হঠাৎ করে ছায়ার মতো নেমে আসে সেই লুকানো সৈন্যরা। মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে যায়। একা খালিদ—চারদিক থেকে আক্রমণ। মৃত্যু যেন এক নিঃশ্বাস দূরে…
কিন্তু এ যে খালিদ। বিপদের মাঝেই যার জন্ম নেয় নতুন কৌশল।
তিনি আচমকা হরমুজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন, এমনভাবে মাটিতে গড়াতে থাকেন যে শত্রু সৈন্যরা আঘাত হানতে গিয়ে নিজের নেতাকেই আঘাত করার ভয়ে থমকে যায়। এক অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধি—যা মুহূর্তেই যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেয়।
ঠিক তখনই বজ্রপাতের মতো এসে হাজির হন বীর যোদ্ধা কাকা ইবন আমর। তার তলোয়ার যেন বিদ্যুৎ—ডান-বাম ছুটে চলে, শত্রুরা একে একে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়ায়। খালিদ আবার উঠে দাঁড়ান—দৃঢ়, অটল, অজেয়। এরপর এক চূড়ান্ত আঘাত—হরমুজ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
নেতার পতনে মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে পারস্য বাহিনীর মনোবল। যারা কিছুক্ষণ আগেও ছিল দুর্ধর্ষ, তারা এখন দিশেহারা—ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে থাকে মরুভূমির বুকে।
এই যুদ্ধ শুধু একটি বিজয়ের গল্প নয়। এটি বুদ্ধি বনাম প্রতারণা, সাহস বনাম ষড়যন্ত্র, এবং বিশ্বাস বনাম ভয়ের এক জীবন্ত দলিল। ইতিহাস আজও সাক্ষ্য দেয়—যেখানে কৌশল আর ঈমান একসাথে দাঁড়ায়, সেখানে বিজয় অবশ্যম্ভাবী।
শেষ কথা: এই যুদ্ধ ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায় হলেও, শুধু এই ঘটনার ভিত্তিতে “হরমুজ প্রণালী”-এর নামকরণ হয়েছে—এমনটি ভাবা সঠিক নয়। হরমুজ প্রণালী নামটি মূলত এসেছে পারস্য উপসাগরের একটি প্রাচীন অঞ্চল ও দ্বীপ “হরমুজ” থেকে, যা ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকে বহু আগ থেকেই পরিচিত ছিল। তাই নামের পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক ইতিহাস, আর খালিদ ইবন আল-ওয়ালিদের বীরত্বগাথা রয়েছে যুদ্ধের ইতিহাসে—দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট, কিন্তু দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয়।
Leave a Reply