
বাতেনুজ্জামান জুয়েল
এখানে মানুষ আর মানুষ নেই— পাশের ফ্ল্যাটে, একই সিঁড়িতে, একই ছাদের নিচে লুকিয়ে আছে হিংস্র জানোয়ার। সুযোগ পেলেই তারা ছিঁড়ে খায় নিষ্পাপ শৈশব।
আট বছরের ছোট্ট রামিসা স্কুলে যাচ্ছিল। হাতে হয়তো বই ছিল, মনে হয়তো ছিল ক্লাসের আনন্দ। কিন্তু এই সমাজ তাকে স্কুলে যেতে দেয়নি। তাকে টেনে নেওয়া হয়েছে নরকের ভেতরে। তারপর তার ছোট্ট শরীরের উপর চালানো হয়েছে পাশবিকতা। রক্ত ঝরেছে। চিৎকার থেমে গেছে। তারপরও শেষ হয়নি হিংস্রতা। দেহ কাটা হয়েছে। মাথা আলাদা করা হয়েছে। খাটের নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে শিশুটির নিথর শরীর!
এ কোন বাংলাদেশ?
এ কোন সমাজ?
এখানে কি মানুষ বাস করে, নাকি মুখোশ পরা দানব?
সবচেয়ে লজ্জার বিষয়— এসব ঘটনার পর আমরা ফেসবুকে কিছু স্ট্যাটাস দিই, কয়েকদিন কান্নার ইমোজি দিই, তারপর আবার ব্যস্ত হয়ে যাই নিজেদের জীবন নিয়ে। যেন কিছুই হয়নি! অথচ একটি মা আজীবন বেঁচে থাকবেন সন্তানের খণ্ডিত দেহের সেই বিভীষিকা বুকে নিয়ে।
যে সমাজ শিশুদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সে সমাজ সভ্য হওয়ার অধিকার হারায়।
যে রাষ্ট্র ধর্ষক, বিকৃত লালসার শিকারি আর শিশু হত্যাকারীদের দ্রুত বিচার করতে পারে না, সেই রাষ্ট্রের আইনের প্রতি মানুষের ভয় থাকে না। অপরাধীরা জানে— কিছুদিন পর সব ঠান্ডা হয়ে যাবে। তাই তারা আরও হিংস্র হয়, আরও সাহসী হয়।
আজ সময় এসেছে কঠিন প্রশ্ন করার—
কেন জামিনে বের হওয়া ভয়ংকর অপরাধীদের ওপর নজরদারি থাকে না?
কেন প্রতিটি বহুতল ভবনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয় না?
কেন শিশু নির্যাতনের বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে?
কেন এই সমাজ অপরাধীর চেয়ে ভুক্তভোগীর পরিবারকে বেশি অসহায় বানায়?
আমরা যদি এখনও না জাগি, তাহলে আগামীকাল আরেকটি রামিসা মরবে। হয়তো আপনার বাসায়, আপনার ফ্ল্যাটে, আপনার সন্তানের পাশে দাঁড়িয়ে আছে পরবর্তী সেই জানোয়ার।
শুধু মোমবাতি জ্বালিয়ে, পোস্ট লিখে, মানববন্ধন করে দায়িত্ব শেষ হবে না।
এখন সময় ভয়ংকর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার।
সময় এসেছে শিশু নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা দেখানোর।
সময় এসেছে এমন বিচার নিশ্চিত করার, যাতে পরবর্তী কোনো বিকৃত মানুষ শিশুর দিকে তাকানোর আগেই আতঙ্কে কেঁপে ওঠে।
মনে রাখুন—
রামিসাকে শুধু একজন বিকৃত মানুষ হত্যা করেনি।
তাকে হত্যা করেছে আমাদের নীরবতা, দুর্বল বিচারব্যবস্থা, আর ধীরে ধীরে মৃত হয়ে যাওয়া সামাজিক বিবেক।
Leave a Reply